সোমবার, ৫ জুন ২০২৩
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন 

অরুণ কুমার গোস্বামী

🕒 প্রকাশ: ০২:০৬ পিএম, ২রা মে ২০২৩

#

অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার গোস্বামী :

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গৌরবোজ্জ্বল অবদান রেখে চলেছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলও সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের স্ব স্ব ভূমিকা রাখছে। আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলগুলোর এইসব ভূমিকার বিপরীতে নির্বাচনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে দেশের প্রথম সামরিক শাসক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ষড়যন্ত্রমূলক, ধ্বংসাত্মক এবং নেতিবাচক। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এই যে, রাজনীতির বহমান স্রোতধারার অমোঘ নিয়ম অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বৈধতাদানকারী শাসকদের দ্বারা সৃষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগকে লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে এবং রাজনীতি করতে হচ্ছে। 

অন্যান্য অনেক লক্ষণের মধ্যে স্থিতিশীল এবং প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত গণতন্ত্রের অন্যতম একটি লক্ষণ হলো একটি নির্বাচিত পার্লামেন্টের মেয়াদ পূরণ হবার পর নির্দিষ্ট সময়ে আর একটি নির্বাচিত পার্লামেন্ট তথা সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে থাকে। ঠিক যেমন উপমহাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের রেওয়াজ অনুযায়ী নিয়মতান্ত্রিক একজন রাষ্ট্রপ্রধান ‘রাষ্ট্রপতি’র মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর আর একজন ‘রাষ্ট্রপতি’ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে এমন না হলেও নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রথমবারের মত একজন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর আর একজন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

গত ২৪ এপ্রিল ২০২৩ ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। এদিন ২১তম মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ২২তম মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন-এর কাছে দায়িত্বভার হস্তান্তর করেন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব হস্তান্তর উপলক্ষ্যে বঙ্গভবনে জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।  এটি এই দেশে প্রথম। যে দেশে অর্ধশতাব্দীতে একাধিক রাষ্ট্রপতি নিহত হয়েছেন; মেয়াদ পূর্ণ করার নজির কম, সেখানে মো. আবদুল হামিদের শান্তিপূর্ণভাবে দুই মেয়াদ পূর্ণ করে বঙ্গভবন থেকে আনুষ্ঠানিক রাজসিক বিদায় নেওয়ার ঘটনা দেশে স্থিতিশীল ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরে। এসময় ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ উচ্চারণ করেন।   

এবার নজর দেয়া যাক প্রথম সামরিক শাসক দ্বারা সৃষ্ট রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কাহিনীর দিকে। বিএনপির শাসনামলে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনও নজির নেই । এমনকি ১৯৯০-এর দ্বিতীয় গণতান্ত্রিক ট্রানজিশনের পরে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা বিএনপি-জোট সরকার মেয়াদ পূর্ণ হবার পর সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারেনি এবং সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব হস্তান্তরে করতে পারেনি। 

প্রসঙ্গক্রমে, সংক্ষেপে বিএনপির নির্বাচনী ইতিহাসের দিকে আলোকপাত করা যেতে পারে। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল পিস্তল ঠেকিয়ে বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলেন তারই নিয়োজিত সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। এরপর ক্ষমতার অদম্য নেশায় ১৯৭৭ সালের মে মাসে জিয়াউর রহমান অভূতপূর্ব মহাকারচুপির “হ্যাঁ” “না” ভোট অনুষ্ঠান করেছিলেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত কারচুপির রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং বাংলাদেশ আর্মি অ্যাক্টের ২৯২ এবং ২৯৩ বিধি ভঙ্গ করে নির্বাচনে জিয়াউর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কারচুপির মাধ্যমে জয় ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান ১৯৭২ সালে প্রবর্তিত দালাল আইন ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর বাতিল করে ১১ হাজার সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের আপনজন হয়েছিলেন।

১৯৭৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল জিয়া এক ফরমান জারির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে সব ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নামে নিজের হাতে কুক্ষিগত করেছিলেন। জিয়া একাধারে রাষ্ট্রপতি, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং সেনাবাহিনীর ষ্টাফ প্রধানের পদে থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত  হয়। জিয়া সরকারের নিয়ন্ত্রণে এই নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও দুর্নীতি হয়। 

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে দ্বিতীয় সামরিক শাসককে পদত্যাগে বাধ্য করানোর পর দেশে দ্বিতীয় গণতান্ত্রিক ট্রানজিশন হয়। এসময় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বিএনপি সরকার ১৯৯৪  সালের ২০ মার্চ মাগুরা-২ উপনির্বাচন কারচুপির নির্বাচন অনুষ্ঠান করে, যেটি প্রকৃত পক্ষে কারচুপির নির্বাচনের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিএনপির অধীনে নির্বাচনের কলঙ্কজনক উদাহরণ হচ্ছে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একদলীয় নির্বাচন। যে নির্বাচনে বিএনপি ছাড়া আর কোনও দল অংশগ্রহণ করেনি। এরপরে আসে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের কলঙ্ক ও অন্ধকারাচ্ছন্ন মেয়াদকাল। নির্বাচনের ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসাবে গণ্য করা হয়। এই নির্বাচনের সময় এবং পরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন ও নিপীড়ন করা হয়। এসময় জঙ্গি সংগঠনের ব্যাপক উত্থান এবং তাদের তৎপরতা বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পায়। সেই সময়ে, তারেক রহমানের হাওয়া ভবন জেএমবি এবং হুজি-বিকে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছিল।

১৯৭৩ সালের নির্বাচিত প্রথম জাতীয় সংসদের মেয়াদ ছিল ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত। কিন্তু তার আগেই খুনী খোন্দকার মোশতাক এবং জিয়াউর রহমান গং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হত্যাকে ‘সো হোয়াট’ বলে প্রথম সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজের ক্ষমতা দখলের পথ নিশ্চিত ও নিরাপদ করতে যত ধরনের ছল-চাতুরি করা সম্ভব সবই করেছেন! অক্সফোর্ড রেফারেন্সে জিয়াউর রহমানকে ‘রাজনৈতিক চক্রান্তের একজন মাস্টার’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যিনি সামরিক অভ্যুত্থান এবং পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানের তরঙ্গে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে, একজন কর্তৃত্ববাদী নেতা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

একইভাবে দ্বিতীয় সামরিক শাসকের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ অনুষ্ঠিত ৩য় এবং ৪র্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল কলঙ্কিত। সামরিক শাসনের অধীনে থাকা অবস্থায় এমনকি দেশের পবিত্র সংবিধান স্থগিত করা হয়েছিল!  

নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ মেয়াদকালে ক্ষমতায় থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের নিকট শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। পঁচাত্তর পরবর্তী আওয়ামী লীগের জন্য ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে জয়লাভ ছিল বিভিন্ন কারণে ঐতিহাসিক। এই সময়ে কলঙ্কিত ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়েছিল। এর ফলে সুদীর্ঘ ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারে ‘কলঙ্কিত’ আইনী বাধা দূরীভূত হয়। কিন্তু হত্যার বিচার পুনরায় বাধার সম্মুখীন হয় ২০০১ এ বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসার ফলে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কলঙ্কতম অধ্যায় রচিত হয়েছিল ২০০১ এর নির্বাচনের মাধ্যমে। 

মাহফুজ আনামের ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ও নিবন্ধে এবং আনোয়ারা বেগম নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত একজন অধ্যাপক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে করা তার পিএইচডি থিসিসে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তার কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হলো এই যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির মূল এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। তাছাড়া, দেশের উচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করে দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রভিশন বাতিল করে দিয়েছে।

নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত ৭ম জাতীয় সংসদ এর মেয়াদ পূরণ হওয়ার পরে ২০০১ এ অনুষ্ঠিত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের মেয়াদ পূরণের পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সময় মত হয়নি। প্রলম্বিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপি-জামাতের সময়ে তৈরি করা ১ কোটি ২০ লক্ষ ভুয়া ভোটারের সন্ধান পায়। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এসময় জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদের মেয়াদান্তে সুষ্ঠুভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও একাদশ জাতীয় সংসদের মেয়াদ পূর্তির পূর্বে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে । এসব বিষয়ে আলোচনা শেষে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই নির্বাচিত জাতীয় সংসদের মেয়াদ পূর্তির সাথে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যা আর কোনও দলের পক্ষে সম্ভব হয়নি। 

অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার গোস্বামী: পরিচালক, সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ; সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু পরিষদ।

আরো পড়ুন:

সন্ত্রাসী দমনে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এগিয়ে