spot_img
32 C
Dhaka
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

১৭ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

২রা ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শেখ হাসিনার হাতে পিতার পতাকা

- Advertisement -

তোফায়েল আহমেদ ::
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার লাল সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শামসুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাতারা দলের আত্মপ্রকাশের দিন হিসেবে ইতিহাস থেকে ২৩ জুন তারিখটি বেছে নিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়মতান্ত্রিক পথে সংগ্রাম করে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানের মধ্য দিয়ে ইতিহাসে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ নামগুলো সমার্থক হয়ে উঠেছে।

বঙ্গবন্ধু রচিত দুটি গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অমূল্য এই গ্রন্থদ্বয় প্রকাশ করায় বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট আমরা কৃতজ্ঞ। ইতিহাসের অনেক অজানা কথা এই বই দুটো থেকে আমরা জানতে পেরেছি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই বঙ্গবন্ধু হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেন, ‘এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি। একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে।’ সেই উদ্দেশ্যে ‘৪৮-এর জানুয়ারিতে ১৫০নং মোগলটুলিতে ‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ নামে সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ‘গণবিচ্ছিন্ন নেতৃত্বের স্থলে জনসম্পৃক্ত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা’ করে গণমানুষের অসাম্প্রদায়িক দল গঠন। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার আগে ‘৪৮-এর ৪ জানুয়ারি ‘ছাত্রলীগ’ প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মহান ভাষা আন্দোলন ও মহত্তর মুক্তিযুদ্ধের বীজ রোপিত হয়।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের উদ্যোগে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পূর্ব বাংলায় সফল ধর্মঘট পালিত হয়। সূচিত হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের। ‘৪৯-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্নবেতনভোগী কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া আদায়ের সংগ্রাম সংগঠিত করার কারণে ১৯ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকে প্রথমে কারারুদ্ধ ও পরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করে শর্ত দেওয়া হয়, যদি তিনি বন্ড দিতে সম্মত থাকেন তবে ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হবে। বঙ্গবন্ধু অন্যায় সিদ্ধান্তের কাছে নতি স্বীকার করেননি।

১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিলে ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ‘৫৪-তে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জিত হয়। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য বঙ্গবন্ধু ১৫ মে সমবায়, ঋণ ও গ্রামীণ পুনর্গঠনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিন্তু কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী অন্যায়ভাবে ৯২-ক ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট সরকার বরখাস্ত ও বঙ্গবন্ধুকে কারারুদ্ধ করে।

‘৫৫-এর ২১, ২২ ও ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ প্রত্যাহার করে আওয়ামী লীগ সর্বধর্মের মানুষের অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ‘৫৬-তে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে বঙ্গবন্ধু বাণিজ্য, শ্রম ও শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ‘৫৭-এর ৮ আগস্ট মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তার কাছে দলের দায়িত্ব মন্ত্রিত্বের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলগুলোর এক কনভেনশনে বাঙালির মুক্তিসনদ ছয় দফা উত্থাপন করে তা বিষয়সূচিতে অন্তর্ভুক্তের প্রস্তাব করেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু সভার সভাপতি ‘ছয় দফা’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় অস্বীকৃতি জানালে ১১ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরে ঢাকা বিমানবন্দরে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন ও ২০ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ছয় দফা দলীয় কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

‘৬৬-এর ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের এই কাউন্সিল ছিল বাঙালির ইতিহাসে বাঁক পরিবর্তন, যা ‘৬৯-এর মহান গণঅভ্যুত্থান, ‘৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন ও ‘৭১-এর মহত্তর মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করে।

ছয় দফা দেওয়ায় সামরিক শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ মামলার আসামি করে তাকে ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা করে। জাগ্রত ছাত্রসমাজ সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ছয় দফাকে হুবহু ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে আসাদ, মকবুল, রুস্তম, মতিউর, আলমগীর, সার্জেন্ট জহুরুল হক, ড. শামসুজ্জোহাসহ নাম না জানা অগণিত শহীদের রক্তের বিনিময়ে ‘৬৯-এ প্রবল গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে। জাতির পিতাকে ‘৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি ফাঁসির মঞ্চ থেকে মুক্ত করে ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ১০ লক্ষাধিক লোকের জনসমুদ্রে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে।

১৯৭০ সালের ২ জুন জাতির পিতার নির্দেশে ও বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতার উপস্থিতিতে আমি আওয়ামী লীগে যোগদান করে দলের একজন কর্মী হয়ে নিজের জীবন ধন্য করেছি। এরপর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ‘৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি ও জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হই।

সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে জেনারেল ইয়াহিয়া খান তখন নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক বক্তৃতা দিয়ে নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করেন এবং বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বর্তমানে ইউনেস্কো ঘোষিত ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রামাণ্য দলিল’ হিসেবে স্বীকৃত অতুলনীয় এই বক্তৃতাই ছিল মূলত আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা।

বঙ্গবন্ধুর ডাকে এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে হাতিয়ার তুলে নিয়ে প্রিয় মাতৃভূমির বীর সন্তানরা মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশ শত্রুমুক্ত হলেও বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন, কেমন আছেন, আমরা জানতাম না। ‘৭২-এর ৮ জানুয়ারি যেদিন বঙ্গবন্ধুর মুক্তির সংবাদ পেলাম, সেদিন সারাদেশে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। ১০ জানুয়ারি তিনি স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। সেদিন মনে হয়েছে আজ আমরা প্রকৃতই স্বাধীন। এরপর ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করে দেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় বঙ্গবন্ধু আমাকে তাঁর রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ করেন।

১৯৭২ সালের ৭-৮ এপ্রিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের বর্ণাঢ্য কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু পুনরায় সভাপতি ও জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু যে মুহূর্তে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে স্বাভাবিক করেন, অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি দেন, ঠিক তখনই ঘাতকের নির্মম বুলেটে একাত্তরের পরাজিত শক্তি, বাংলার মীরজাফররা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। ওই সময় তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রবাসে থাকায় ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পান।

ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু ধাপে ধাপে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পৌঁছেছেন। আজ বিনম্র শ্রদ্ধায় জাতির পিতাকে স্মরণ করে এ কথাই মনে করি যে, সারাটি জীবন তিনি জেল-জুলুম-অত্যাচার-নির্যাতন সবই সহ্য করেছেন আওয়ামী লীগকে গড়ে তুলে দেশ স্বাধীন করার জন্য। দলের কর্মীদের তিনি পরিবারের সদস্য মনে করতেন। আওয়ামী লীগের জন্মকালে বঙ্গবন্ধু দলের দপ্তরেই থেকেছেন। সেখানেই তার কর্মব্যস্ততা, আহার-নিদ্রা-বিশ্রাম।

দেশের মানুষকে বঙ্গবন্ধু হৃদয় উজাড় করে ভালোবেসেছেন। বারবার ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছেন। মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্যে পরিণত করেছেন। বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রশ্নে কোনো রক্তচক্ষুকেই তিনি পরোয়া করেননি। তার দক্ষতা, সাহস, সীমাহীন ত্যাগ, অসীম ধৈর্য আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। জীবনের যৌবনের প্রায় ১৩টি মূল্যবান বছর তিনি পাকিস্তানের কারাগারে কাটিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে খুনিচক্র মনে করেছিল, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ‘৮১-এর ১৭ মে স্বদেশের মাটি স্পর্শ করে শহীদের রক্তে ভেজা আওয়ামী লীগের পতাকা হাতে তুলে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ তথা অর্থনৈতিক মুক্তির দায়িত্বভার গ্রহণ করে বাংলাদেশকে আজ অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করেছেন।

শেখ হাসিনা যা বিশ্বাস করেন, জাতির পিতার মতো তাই তিনি বলেন এবং বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অনুষ্ঠান তারই অদম্য প্রমাণ। বঙ্গবন্ধু দুটি লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতি করেছেন। একটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আরেকটি অর্থনৈতিক মুক্তি। তিনি আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছেন; কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে যেতে পারেননি। সেই কাজটি দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা করে চলেছেন।

লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি- বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ও সাবেক মন্ত্রী।

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ