spot_img
25 C
Dhaka

২রা ডিসেম্বর, ২০২২ইং, ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯বাংলা

শূন্য কোভিড নীতি, চীনের জন্য আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ

- Advertisement -

ডেস্ক রিপোর্ট, সুখবর বাংলা: চীনে কোভিড সংক্রমণ যতদিন না পর্যন্ত শূন্যে নেমে আসছে ততদিন পর্যন্ত সরকার কাজ করে যাবে বলে জানান চীনের নেতা শি জিনপিং। কিন্তু সরকারের এই “শূন্য কোভিড নীতি” এর কারণে দেশে শুরু হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। তারই একটি চিত্র দেখতে পাওয়া যায় ঝেংঝু শহরের ফক্সটন প্ল্যান্টে।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষ যে অ্যাপল কম্পিউটার কিনার জন্য উদগ্রীব। কিন্তু সে কোম্পানিরই অধিক সংখ্যক কর্মকর্তারা কোভিড এর সংক্রমণ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে ভীত ও আতঙ্কিত হয়ে কোম্পানি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।

এই বিশাল সংস্থাটির পরিচালক, ফক্সকন কোম্পানিকে অবশ্যই এ ঘটনার দায়ভার নিতে হবে। কিন্তু এ বিশৃঙ্খলার মূলে রয়েছে দেশের কঠোর “শূন্য কোভিড নীতি।”

বিবিসি সেখানকার কর্মীদের সাথে কথা বলতে চাইলে তারা জানায়, তারা তাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য কোম্পানি ছেড়ে চলে যেতে চাইছে। হয়তোবা তাদের এ চাওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। কিন্তু তারা অত্যন্ত ভীত এবং নিজেদের জীবন বাঁচাতে তারা আর অন্য কোনও উপায় দেখতে পারছেন না।

একজন ২১ বছর বয়সী কর্মী জানান, তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই কোভিড নিয়ে নানা গুজব শুনছেন। দিনদিন এ গুজব বেড়েই যাচ্ছে এবং তারা এ ব্যাপারে আরো ভয় পাচ্ছেন।

তাদের মালিক যদিও তাদের আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, এ কোম্পানিতে কোভিড আক্রান্ত কোনো কর্মী নেই এবং কোন কর্মীর মাঝেই কোভিডের কোনও লক্ষণ ও নেই। তবে তারা তাদের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা থেকে জানেন যে, এমন অনেকেই আছেন যারা কোনোরকম লক্ষণ ছাড়াই কোভিড পজিটিভ হয়েছিলেন।

কোম্পানি ছেড়ে না যাওয়ার জন্য প্রত্যেক কর্মীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কর্মীদের তাদের শ্রমিক আবাস ও ফ্যাক্টরিতে বন্দি করে রাখার চেষ্টা করা হলে তাদের ভয় ও আতঙ্ক আরো বেড়ে যায়।

সেনাবাহিনীরা এসে পুরো অঞ্চলের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে এবং এ অঞ্চলের প্রত্যেককে কোভিডের সাথে লড়াই করেই বাঁচতে হবে- এমন গুজবে ভীত হয়ে আছেন কর্মীরা।

গুজব অনুযায়ী, তারা এখানে এসে দেখবে কোভিডের সাথে লড়াই করতে এখানকার মানুষেরা সক্ষম কি না। পরিস্থিতি ভয়াবহ না হলে চীনের অন্যান্য লকডাউনকৃত অঞ্চল খুলে দেওয়া হবে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা “ফক্সকনে থাকতে গেলে মরতেই হবে” নামক আরেকটি গুজব ছড়িয়ে দেয়।

এ গুজবগুলো শুধুমাত্র একজন কর্মী নয় বরং অনেকেই শুনেছে এবং বিশ্বাস ও করেছে। গত শনিবার রাতে, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় একজন কর্মী হলুদ রংয়ের বেড়া অতিক্রম করে কোম্পানি থেকে পালিয়ে যায়।

পরেরদিন সকালে, আরো কর্মীরা নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার আর্জি জানায়।

২১ বছর বয়সী ঐ কর্মী একটি শ্রমিক আবাসে ৮ জনের মতো একত্রে থাকতেন। কিন্তু এদের মধ্যে ৪ জনই ভয় পেয়ে নিজেদের বাড়িতে চলে গেছে। তিনি নিজেও
সবকিছু গুছিয়ে চলে যেতে চাচ্ছিলেন।

আরেকজন কর্মী জানান, তিনি জানতেন না অবস্থা এতো ভয়াবহ। কিন্তু যখন তার আশেপাশের কর্মীরা অসুস্থ হতে শুরু করেন তখন তিনি অত্যন্ত ভয় পেয়ে যান। কোম্পানির কাজ যেন বন্ধ না হয় সেজন্য কর্মীদের কোয়ারান্টাইনেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছেনা। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে খুব শীঘ্রই কোম্পানির সব কর্মী কোভিড পজিটিভ হয়ে যাবে।

ফক্সকন কোম্পানির কর্মী ছাড়াও ঝেংঝু শহরের অবস্থার ভিত্তিতে ফোন এপ হেলথ কোড কাউকেই আনুষ্ঠানিকভাবে শহর ছেড়ে যাবার অনুমতি দিবে না।

অর্থাৎ যানবাহন চললেও কাউকে যেতে দেওয়া হবে না। এমনকি কেউ ট্যাক্সি দিয়েও যেতে পারবেন না।

যার ফলে ফক্সকন কোম্পানির কর্মীরা এ পরিস্থিতিতে বাধা পেরিয়ে পায়ে হেঁটে তাদের গন্তব্য পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নিলো।

রাস্তায় লাগেজ টেনে নিয়ে যাওয়া তরুণ তরুণীদের চিত্র এখানে এখন রোজকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, গাড়ির চালকেরা তাদের উপর করুণা দেখিয়ে এক দু’জনকে গাড়িতে তুলে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে।

ট্রাকের পেছনে এমন এত এত শ্রমিকদের নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা- পেরিয়ে আসা সেই ভয়াবহ সেই দিনগুলোর কথাই বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে।

এই ধরনের নানা তথ্য চিত্র প্রথমে হেনান প্রদেশে, পরে চীনে এবং পরবর্তীতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

এই শূন্য কোভিড নীতির কারণে দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

এই রোগ সম্পর্কে অনেকের অজ্ঞতার কারণে মানুষ এ রোগটিকে ক্যান্সারের মতো ভয় পাচ্ছে।

চীনা সরকারও জনগণের এ ভুল বুঝাবুঝি আটকাতে কোনও পদক্ষেপই নেয়নি। বরং সরকার এমন কিছু কাজ করেছে যাতে জনগণ আরো ভয় পেয়েছে।

দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনের লোকেরা বলেন, যখন পৃথিবীর অন্যান্য দেশ করোনা ঝুঁকির কারণে ধুঁকছে তখন চীনাদের সত্যিই নিজেদের ভাগ্যবান মানা উচিত। কমিউনিস্ট সরকার তাদের সুরক্ষার জন্য শূন্য কোভিড নীতি প্রবর্তন করেছে।

যেখানে কোভিডের কারণে হাসপাতালে অসুস্থ রোগীর ভীড় লেগে যেতো সে জায়গায় এ নীতির কারণে হাসপাতালে এখনো তেমন ভীড় দেখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ কম মানুষ অসুস্থ হচ্ছে।

তবে এটাও সত্যি যে, যারা কোভিড প্রতিরোধী টিকা নিয়েছেন, তারা যদি কোভিড আক্রান্ত হয়েও যান তবুও কয়দিন বাসায় পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিলে তারা সুস্থ হয়ে উঠবেন।

যখন ফক্সকনের কর্মীরা নিজেদের বাড়ির এলাকায় পৌঁছে তখন তাদের স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে কোয়ারান্টাইনে রাখা হয়। তখন তারা উপলব্ধি করতে পারে যে তারা অযথাই ভয় পাচ্ছিল।

তারা জানে না তারা তাদের চাকরিতে আবার যেতে পারবে কি না। তারা এটাও জানে না তাদের শ্রমিক আবাস বা হোস্টেলে যে জিনিসগুলো তারা ফেলে এসেছে সেগুলো তারা আর আনতে পারবে কি না। তারা তাদের কাজের বোনাসের টাকা পাওয়ার সুযোগটাও হারিয়েছে। তবে হ্যাঁ, নিজেদের সুরক্ষা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়।

স্বাভাবিকভাবেই শ্রমিকদের এভাবে পালিয়ে যাওয়ার চিত্র সারাদেশে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ফক্সকনও এ বিষয়ে তাদের মতামত জানিয়েছে।

কোম্পানিটি ঘোষণা করেছে, যেসব কর্মীরা বাড়িতে যেতে চায় তারা নির্দ্বিধায় কোম্পানির বাসে করে যেতে পারবে। তবে যারা কাজ ছেড়ে যেতে চায় না, তারা তাদের কাজের জন্য চারগুণ বেশি টাকা পাবে।

ঝেংঝো বিমানবন্দরে লকডাউনের কারণে কোম্পানির উৎপাদনে তা বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। তাই থেকে যাওয়া কর্মীদের এ বাড়তি টাকা দেওয়াটা তাদের কোম্পানির উৎপাদনের হারকে আবার স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া মাত্র।

একজন স্বেচ্ছাসেবককে রাস্তার পাশে খাবার ও জল বিতরণ করতে দেখা যায়। তিনি জানান যে, হাজার হাজার মানুষ এ শহর ছেড়ে চলে গেছে।

যদি ফক্সকন ঠিকমতো এ পরিস্থিতিকে না সামলাতে পারে, তবে বিশ্ববাজারে এপল এবং অন্যান্য পণ্যগুলির সরবরাহ ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

হয়তোবা এ পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত চীনের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছেনা, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা চীনের জন্য হুমকি ডেকে আনবে।

কোভিড নিয়ন্ত্রণের সরকারের এ পদক্ষেপ জনগণের জীবন এবং দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।

চীনের নেতা শি জিনপিং এর জন্য এ পরিস্থিতি সামলানোর চেয়ে উনার রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন হয়তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এমনভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে চীনের কাছে দুইটি পথই খোলা থাকবে। হয় শূন্য কোভিড নীতি পরিবর্তন কর নয়ত ফক্সকনের মতো এমন চিত্র দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাও।

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ