spot_img
28.3 C
Dhaka

১লা ডিসেম্বর, ২০২২ইং, ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯বাংলা

সর্বশেষ

শি জিনপিংয়ের তৈরি করা বিশ্বে কি জায়গা হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের?

- Advertisement -

ডেস্ক রিপোর্ট, সুখবর বাংলা: গত দশ দিন আগে, বিশ্বের একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে পরিচিত শি জিনপিং এর বর্তমান প্রশাসনিক কার্যকলাপকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বিদেশি সাংবাদিকেরা বিশ্বের দরবারে তার মানহানি ঘটাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ জানান।

দুইবার ক্ষমতায় থাকাকালীন উনার নিজের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু এই তৃতীয়বার যখন তিনি ক্ষমতায় এসেছেন, তখন নিজের সব সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে তিনি এখন দেশের জন্য কাজ করতে চান।

কিন্তু শি’র এই পদ আঁকড়ে ধরে থাকাটাকে বিশ্বমহল ভালো চোখে দেখছে না।

কমিউনিস্ট নেতারা সবসময় চীনকে শক্তিশালী করতে কাজ করে গেছেন। শি বিশ্বাস করেন বর্তমান সময়ে চীন যত ধনী হবে ততোই সব দিক দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করবে।

এই বিশ্বাস কয়েক দশক ধরে চলে আসা বেইজিং ও ওয়াশিংটনের বাণিজ্যকে নতুন গতি দিয়েছে।

এ দুটি দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের কারণে প্রতি বছর অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারেরও অধিক মূল্যের পণ্য প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেয়।

শি তৃতীয় মেয়াদের তার শাসনকালে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। প্রযুক্তিক্ষেত্রে চীনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাই বারবার চীনকে পেছনের দিকে টানছে, যেন চীন এগিয়ে যেতে না পারে।

বেইজিং কর্তৃপক্ষ জানান যে, এই অবস্থার জন্য দায়ী মূলত যুক্তরাষ্ট্র। তারা বিশ্ব দরবারে নিজেদের উচ্চ আসনে বসানোর জন্য চীনের অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সাম্প্রতিক জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল সারাবিশ্বের জন্য মস্কোর চেয়েও বেইজিং কে বড় হুমকি হিসেবে দেখছে। ওয়াশিংটন ভবিষ্যৎ হুমকির কথা বাদ দিয়ে বর্তমান সময়ে চীন তাইওয়ানের সাথে যা করছে সেটাকেই বড় হুমকি হিসেবে দেখছে।

রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন চীনকে নিজের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছেন। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ব্যবহার করে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে চীন যেন এগিয়ে না যায় তাই বারবার বাধার সৃষ্টি করছেন বাইডেন।

এই বাইডেনই ১৯৯০ এর শেষ দিকে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় তৎকালীন মার্কিন সিনেটের সদস্য হিসেবে চীনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।

২০০০ সালে সাংহাই ভ্রমণের সময় বাইডেন বলেছিলেন, চীনের বাণিজ্য বৃদ্ধি দেশটিকে বিশ্ব দরবারে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে চীনকে সর্বোচ্চ সাহায্য করবে কারণ চীন আমাদের কোনও শত্রু নয়।

ব্রিটিশ আমেরিকান জোট তখন চীনের কাছে নিজেদের মাদকদ্রব্য বিক্রি করে ব্যবসার এক নতুন সূচনা করতে আগ্রহী ছিল। উপরন্তু ইউএস-চীন সংস্থা কম মূল্যে অনুগত শ্রমিক পাওয়ার জন্যেও উদগ্রীব ছিল।

তবে মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন যে কেউ বলতে পারবে যে চীনের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদান ন্যায্য ছিল।

টেক্সাসের তৎকালীন গভর্নর বুশ, ২০০০ সালের মে মাসে, তার নির্বাচনী প্রচারণার সময় দিনমজুরদের জন্য তার সবচেয়ে সুন্দর বক্তব্য দিয়েছিলেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে চীনের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক টা শুধুমাত্র টাকাতেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি দায়বদ্ধতার ব্যাপার।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা একটি দেশকে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ নেয়। যখন একটি দেশে প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয় ঠিক তখনি বলা যায় যে দেশটিতে গণতন্ত্র বজায় আছে।

কিছু সময়ের মধ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতিতে বিশ্বের অনেকেই খুশি হয় এই ভেবে যে দেশটিতে এতদিনে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক এক পালাবদল ঘটতে চলেছে। বিশ্ব মিডিয়াও তখন চীনকে সুযোগ দেয় তার চিন্তাচেতনাকে বিশ্বের অন্যান্য মানুষদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার, যা একসময় চীনের জন্য অকল্পনীয় ছিল।

বিল ক্লিনটন চীনের জন্য ইন্টারনেট সেবাকেও সহজ করে দেন।

এমনকি শি যখন ২০১২ সালে প্রথম মেয়াদে শাসনে আসেন সেই সময়ও সংবাদ মাধ্যমগুলো চীনের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতিকে তুলে ধরে বিশ্বকে চীনের দ্রুত পরিবর্তনশীলতার কথা জানিয়ে দেয়।

কিন্তু শি তার শাসনকালের প্রথম মেয়াদেই বুঝে গিয়েছিলেন তাদের এ ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি বিশ্বায়নের যুগে অনেকেই মানতে পারবে না আর তাই ভবিষ্যতের জন্য তাদেরকে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে।

তার প্রথম মেয়াদের কয়েক মাসের ভেতরেই কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় নথি নং ৯ জারি করে। এতে সাতটি বিপদের তালিকা করা হয় যেসব বিপদগুলো তাদের মোকাবেলা করতে হবে। যার মধ্যে রাজনৈতিক দলের বাইরের সুশীল সমাজ এবং সাংবাদিকদের অবাধ স্বাধীনতা প্রদান অন্তর্ভুক্ত ছিল।

শি বিশ্বাস করেন যে আদর্শগত দুর্বলতা এবং সমাজতন্ত্রকে ঠিকমতো প্রতিষ্ঠা না করতে পারার ব্যর্থতার কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়।

তার দ্বিতীয় মেয়াদের সময় আইনজীবীদের অহেতুক জেলবন্দী করা হয়, হংকং এর স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয় এবং জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুরদের উপর অমানবিক অত্যাচার করা হয়।

কিন্তু সেইসময়েও পশ্চিমা বিশ্ব চীনের সাথে নিজেদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায়নি বা চীনের কার্যকলাপের প্রতিবাদ করেনি যা তারা এখন করছে।

চীনের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় অংশগ্রহণের ফলে কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন দেশ চীনের দ্বারা উপকৃত হয়েছে। তারা চীনা শ্রমিকদের কাজে লাগাতে পেরেছে, চীনের সাথে বাণিজ্য করে বিশাল অংকের টাকা মুনাফা পেয়েছে।

শি এর শাসনকালীন প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদের সময় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের সুবর্ণ সময় চলছিল।

এমনকি যখন জিনজিয়াং-এ মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো কার্যক্রম চলছিলো তখনো মার্কিন চ্যান্সেলর সেখানকার অর্থনৈতিক সুবিধা তুলে ধরার জন্য জিনজিয়াং এ ভ্রমণ করেন।

যখন তারা নিজেদের সুবিধার কথা ভাবছিল তখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো চিন্তাভাবনা তাদের মাথাতেই আসেনি।

ঠিক সেইসময়ই রাষ্ট্রপতির ছোট ছেলে হান্টার বাইডেন চীনের সাথে বাণিজ্য করতে আসে, যা পরবর্তীতে তর্ক-বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে।

ব্রিটিশ কিংবা আমেরিকানরা অদূরদর্শী নয়। কিন্তু তখন কেউ চীনের দমন পীড়ন নীতির উপর মনোযোগ না দিয়ে চীনের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতিকেই দেখেছে।

তবে চীনের এটা বুঝা উচিত যে হয়তো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতি একসাথে হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু উন্নয়নের জন্য কারো মানবাধিকার হরণ করাটাও উচিত নয়।

চীনে বিনিয়োগ করা এক মার্কিন ব্যবসায়ী বলেন যে, চীন পশ্চিমা বিশ্বের মতো স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়। রাজনীতিতে তাদের ততোটা আগ্রহ নেই, যতোটা আগ্রহ তাদের টাকা রোজগারের প্রতি আছে।

অনেক ব্যবসায়ী এবং সরকারি কর্মকর্তা চীনে রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা বাদই দিয়ে দিয়েছেন। অর্থনৈতিক অগ্রগতিই তাদের জন্য যথেষ্ট। তাদের আর কোনকিছুর প্রয়োজন নেই।

২০১৮ সালেই উইঘুর জাতিরা তাদের উপর হওয়া অত্যাচারের প্রতিবাদ করা শুরু করে। যখন এ বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আসে তখন বিশ্বের প্রতিক্রিয়া দেখে চীন হতভম্ব হয়ে যায়।

মূলত চীনের অনেক অন্যায় সহ্য করেই পশ্চিমা বিশ্ব তার সাথে ব্যবসা করে যাচ্ছিল।

শি’এর দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জেলে পাঠানো এবং এক সন্তান নীতির নৃশংসতা চীনের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

কিন্তু নিজেদের ধর্ম, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির ভিন্নতার জন্য এসব অত্যাচারিত মানুষদের পাশে দাঁড়ায় সমগ্র বিশ্ব। তাদের উপর হওয়া এ অত্যাচার সমগ্র বিশ্বেই বিরূপ প্রভাব ফেলে।

বেইজিং হংকং এর স্বাধীনতাকে হরণ করছিল, দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক শক্তি পাঠিয়েছিল এবং তাইওয়ানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল- সবকিছুই পুরো বিশ্বের জন্য এক একটি হুমকি।

কিন্তু যখন বিশ্ব মিডিয়া এসব তথ্য প্রকাশ করতে থাকে এবং বিশ্ব জনমত চীনের বিরুদ্ধে যেতে থাকে তখন চীন বুঝতে পারে যে এবার তারা বিপদে পড়েছে।

এক দশক আগে মাত্র ৪০% আমেরিকান চীনের বিরুদ্ধে বিরূপ চিন্তাভাবনা পোষণ করত, যা এখন এসে দাঁড়িয়েছে ৮০%-এ।

এ ব্যাপারে ডোনাল্ড ট্রাম্পও ভূমিকা রেখেছেন। ট্রাম্প শি’এর শক্তিশালী ব্যক্তিত্বকে পছন্দ করলেও চীনের অভ্যুত্থান তার পছন্দ ছিল না। তিনি দাবি করেন চীনের সাথে বাণিজ্যে সংযুক্ত হওয়া ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।

যদিও তখন তার বিরোধীরা তার বক্তব্যের বিরোধিতা করেছিল তবে এখন হয়তোবা তারাও এ ব্যাপারে নিজেদের সম্মতি প্রকাশ করবে।

বাইডেন অবশ্য ট্রাম্পের কিছু বাণিজ্য নীতিকে অমান্য করেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্প যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছিল, বাইডেন সে পথে হাঁটেননি।

ওয়াশিংটন দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছে, চীন তার অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে রাজনৈতিক সুবিধায় কাজে না লাগিয়ে কর্তৃত্ববাদী কিছু ব্যক্তিকে শক্তিশালী করে তুলেছে মাত্র।

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কি আদৌ পরিবর্তন হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাইওয়ান সম্পর্কে বাইডেনের করা মন্তব্যে।

চীন যদি তাইওয়ান হামলা করে তখন কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে সাহায্য করবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে বাইডেন জানান, এমন কিছু ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই তাইওয়ানকে সাহায্য করবে।

মূল্যবোধের পরিবর্তে চীন এখন কর্তৃত্ববাদ নীতিতে চলছে। যদিও এ দেশে গণতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান অবনতি দেখা যাচ্ছে তবুও দেশটি আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে।

চীন এখন বিশ্ব বাণিজ্যে এতো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে চীনের সমস্ত অন্যায় মুখ বুঁজে সহ্য করে তার সাথে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ।

তবে চীন যে ক্রমাগত একটি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে সে ব্যাপার ওয়াশিংটন খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে।

বাণিজ্যে এখন পর্যন্ত চীনের বিকল্প তারা খুঁজে পায়নি। চীনের সাথে যারা বাণিজ্য করে তাদেরকে দেশটি নিজের মতো করে পুরস্কৃত করে এবং যারা এ দেশটির সাথে বাণিজ্যে যুক্ত হয়না তাদের উপর অন্যায়ভাবে বিভিন্ন কর আরোপ করে দেশটি।

শি’এর তৃতীয় মেয়াদের নেতৃত্বে বিশ্ব এক অভুতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ্য করছে। কি চীন, কি রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এখন সব জায়গাতেই নিজেরই কর্মফলের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ নিজের প্রতিপক্ষদের মুখোমুখি হতে বাধ্য হচ্ছে।

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ