spot_img
23 C
Dhaka

২৮শে জানুয়ারি, ২০২৩ইং, ১৪ই মাঘ, ১৪২৯বাংলা

শির সৌদি সফর : মার্কিন প্রভাব বলয়ে চীনের ধাক্কা

- Advertisement -

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, সুখবর ডটকম: চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং সাত বছর পর সৌদি আরব সফরে গেলে তাকে নিয়ে আরব বিশ্বের নেতাদের মধ্যে যে মাত্রার যে আগ্রহ উচ্ছ্বাস দেখা গেছে তার নজির বিরল। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারসহ উপসাগরীয় সহযোগিতা জোট জিসিসির সবগুলো দেশের নেতারা প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে বৈঠকের জন্য রিয়াদে আসেন।

পরে শুক্রবার (৯ ডিসেম্বর) একটি চীন-আরব শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিতে রিয়াদে হাজির হন মিশর, তিউনিসিয়া, লেবানন, ইরাক ও সুদানের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। আরব বিশ্বের নৈকট্যের জন্য চীনারাও তাদের আগ্রহ আকাঙ্ক্ষা প্রকাশে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেনি।

প্রেসিডেন্ট শির সফরের ঠিক আগে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এক বিবৃতি জারী করে জানান, চীন রাষ্ট্র সৃষ্টির পর এই প্রথম আরব বিশ্বের সঙ্গে তারা এতটা ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। এই সফর  চীন ও আরব বিশ্বের সম্পর্কে মাইলফলক হয়ে থাকবে। ইতিহাস তৈরি হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট শির একটি লেখা বিভিন্ন সৌদি দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে যেখানে তিনি জানান, আরব বিশ্বের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের ইতিহাস দুই হাজার বছরের পুরনো। ইসলামের নবীর একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন চীনা প্রেসিডেন্ট। যেখানে নবী তার অনুসারীদের জ্ঞানার্জনের জন্য দরকার হলে চীনে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

সৌদি মিডিয়ার মতে, বুধবার (৭ ডিসেম্বর) দুই দেশের মধ্যে নানা ক্ষেত্রে তিন হাজার কোটি ডলার মূল্যের ৩৪টি চুক্তি ও সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট শির এই সফর এবং তাকে নিয়ে সৌদি আরবসহ আরব নেতাদের এই মাতামাতি আমেরিকার যে একবারেই পছন্দ হয়নি তাতে সন্দেহ নেই।

কারণ জ্বালানি সম্পদে সমৃদ্ধ উপসাগরীয় আরব অঞ্চলকে আমেরিকা বহুদিন ধরে তাদের প্রভাব বলয়ের অন্যতম মূল কেন্দ্র হিসাবে বিবেচনা করে। যে দেশের নেতাকে নিয়ে সেখানে এত উদ্দীপনা সেই চীন বর্তমান বিশ্বে আমেরিকার এক নম্বর কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী।

লন্ডনে মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির বিশ্লেষক সামি হামদি জানান, সৌদি আরব এ বছরের শুরুর দিকেই চীনা প্রেসিডেন্টকে আমন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বার বার রিয়াদের কাছে এ নিয়ে আপত্তি জানানো হয়। সে সময় সৌদি মিডিয়ায় চীনা নেতাকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্তের কথা ছাপাও হয়েছিল, কিন্তু পরে তা পড়ে চাপা পড়ে যায়।

কিছুদিন অপেক্ষা করলেও, সৌদি আরব শেষ পর্যন্ত আমেরিকার উদ্বেগ অগ্রাহ্য করলো। শুধু চীনা প্রেসিডেন্টকে আমন্ত্রণই নয়, জুলাইতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন জেদ্দায় গিয়ে তেলের উৎপাদন বাড়ানোর অনুরোধ করলেও ক্ষমতাধর সৌদি যুবরাজ মোহামেদ বিন সালমান পাত্তা দেননি।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন বেশ কিছুদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে, বিশেষ করে সৌদি আরব বা ইউএইর মধ্যে, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য আমেরিকার ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর তাগিদ দেখা যাচ্ছে।

২০১৭ সালে সৌদি আরবের ক্ষমতা হাতে পাবার পর যুবরাজ সালমান আধুনিক ও স্বাবলম্বী একটি দেশে পরিণত করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। এজন্য গুপ্তচরবৃত্তিতে সংশ্লিষ্টতার যুক্তিতে চীনা যে টেলিকম কোম্পানিকে যুক্তরাষ্ট্র নিষিদ্ধ করেছে সেই হুয়াওয়ে সৌদি আরব ও ইউএইসহ বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশে ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক বসিয়েছে।

স্পর্শকাতর তথ্য চুরির ঝুঁকি নিয়ে আমেরিকার কথা এসব দেশ কান দেয়নি। এমনকি বুধবার সৌদি আরব ও চীনের মধ্যে যেসব চুক্তি হয়েছে তার মধ্যে একটি চুক্তির আওতায় হুয়াওয়ে সৌদি আরবে বেশ কতগুলো ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠিত করবে যেখানে ক্লাউডে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সংরক্ষিত থাকবে।

তবে আমেরিকার সঙ্গে সৌদি প্রশাসনের সম্পর্ক শীতল হওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ সাংবাদিক জামাল খাসোগজির হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যুবরাজ সালমানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সম্পর্কের টানাপড়েন।

ঐ হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই খোলাখুলি যুবরাজ সালমানকে দায়ী করে অনেক বক্তব্য দিয়েছেন। তাকে একঘরে করে ফেলার হুমকি দিয়েছেন।

খাসোগজি হত্যাকাণ্ডের জন্য যেন যুবরাজ সালমানকে কখনো যুক্তরাষ্ট্রে মামলায় না পড়তে হয় তার নিশ্চয়তা চেয়ে সৌদি রাজপ্রসাদের পক্ষ থেকে হোয়াইট হাউজের কাছে অনুরোধ করা হলেও এখনও বাইডেন কোনো নিশ্চয়তা দেননি।

সাদি হামদি জানান, যুবরাজ সালমান অপমানিত বোধ করছেন। শি জিন পিংকে নিয়ে তিনি যে মাতামাতি করলেন তার পেছনে আমেরিকাকে দেখানোর বিষয়টিও রয়েছে।

বাইডেন যখন জেদ্দায় আসেন তাদের দুইজনের মধ্যে করমর্দন পর্যন্ত হয়নি। এখন মোহামেদ সালমান শিকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসে আমেরিকানদের দেখাতে চেয়েছেন তিনি নতুন এক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পথ নিয়েছেন। শুধু তিনি নিজে নয় অন্যান্য আরব নেতাদেরও তিনি এই পথে আনছেন।

গত তিনদিনে রিয়াদে যে আড়ম্বর হলো তার প্রতীকী মূল্য অনেক। মোহামেদ সালমান আমেরিকানদের বলতে চেয়েছেন ‘আমাকে তোমরা একঘরে করে দেবে বলেছিলে। এখন দেখ তা হয়নি।’

তবে এটা অনস্বীকার্য যে আরব বিশ্বে বেশ কিছুদিন ধরেই একটা ধারণা দিন দিন জোরালো হচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আমেরিকার আগ্রহ কমছে। সুপার পাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। আরব বিশ্বে এমন কথা এখন খোলাখুলি উচ্চারিত হচ্ছে যে তাদের এখন শুধু আমেরিকার দিকে না তাকিয়ে বহুমুখী সম্পর্কের পথ নিতে হবে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাহ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ভাষণে বলেন, ‘বিশ্ব ব্যবস্থায় আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য আর থাকবে বলে আমার মনে হয়। চীন এখন অর্থনীতিতে প্রধান একটি দেশ, তারা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক শক্তি।’

উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বিশেষ করে সৌদিদের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সৌদি আরব ও চীনের মধ্যে ২০২১ সালে ব্যবসা হয়েছে আট হাজার কোটি ডলারের । এ বছর তা আরও অনেক বেশি হবে। সৌদি আরব এখন চীনের জ্বালানি তেলের প্রধান যোগানদার।

উন্নয়ন ও প্রযুক্তির জন্য চীনসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক করতে উপসাগরীয় দেশগুলোর আগ্রহের বাস্তবতা অনেকটাই মেনে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু অনেক বিশ্লেষক বলছেন কৌশলগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চীনের সম্পৃক্ত হয়ে পড়া নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

উপসাগরীয় দেশগুলাতে হুয়াওয়ে টেলিকম নিয়ে আমেরিকানরা চিন্তিত। চীন এখন সৌদিদের সামরিক ড্রোন তৈরিতে সাহায্য করছে। এমনকি বছরখানেক আগে সিএনএন রিপোর্ট করেছিল চীন সৌদি আরবকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সাহায্য করছে।

গবেষণা সংস্থা আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কর্মসূচির গবেষক জনাথন পিকফোর্ডের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানায়, সৌদি-চীন সম্পর্কের যে বিষয়টি আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তা হলো সৌদিরা মনে করে চীনের সঙ্গে কাজ করা তাদের জন্য সহজ। সৌদিরা মনে করে রাজনীতি নিয়ে চীন মাথা ঘামাবে না। মানবাধিকারের বিষয়ে লেকচার দেবে না। অস্ত্র কোথায় ব্যবহার হবে তা নিয়ে শর্ত আরোপ করবেনা।

আমেরিকার ভয় এসব কারণে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়বে। তবে অধিকাংশ পর্যবেক্ষক মনে করেন, আরব বিশ্বে চীনের পক্ষে এখনও বহুদিন আমেরিকার বিকল্প হয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।

এর প্রধান কারণ, অস্থির এই অঞ্চলে নিরাপত্তার জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে আমেরিকা ছাড়া কোনো গতি নেই।

সাদি হামদি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা যদি আপনি দেখেন তাহলে বুঝবেন আমেরিকার প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব নয়। পুরো অঞ্চলজুড়ে কতগুলো ও কোথায় আমেরিকানদের ঘাঁটি রয়েছে তা দেখলেই আপনি বুঝবেন। এ অঞ্চলের যে কোনও বিরোধের মধ্যস্থতায় আমেরিকার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। চীন এখনও এর ধারেকাছেও নেই।’

তার মতে, সৌদি আরব কতটা চীনের ওপর নির্ভরশীল হতে প্রস্তুত, কতটা আমেরিকার প্রভাবমুক্ত হওয়ার জন্য প্রত্যয়ী তা নিশ্চিত হতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।

হামদি বলেন, ‘রিয়াদে গত তিনদিনে যত ছবি ও যত শব্দের প্রদর্শন হলো বাস্তবে তা কতটা অর্থবহ দেখতে হবে। যেসব চুক্তি হয়েছে তার অধিকাংশই বোঝাপড়া। সেগুলোর বাস্তবায়ন সৌদিরা কতটা করে তা দেখতে হবে। আমি বলছি না আমেরিকার সঙ্গে দরকষাকষির জন্যই এসব করেছে তারা, তবে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের সুইচ বন্ধ করা সৌদিদের পক্ষে সহসা অসম্ভব।’

তবে আরব বিশ্বে আমেরিকার প্রভাব বলয়ে ধাক্কা লাগতে শুরু করেছে সন্দেহ নেই। জুলাইতে মধ্যপ্রাচ্য সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেন উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে ভরসা দিতে গিয়ে বলেছিলেন ‘আমেরিকা কোথাও চলে যাচ্ছেনা।’

সুত্রঃ বিবিসি

এম/

আরো পড়ুন:

‘হিরোস অব দ্য ইয়ার’ ইরানি নারীরা

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ