spot_img
32 C
Dhaka
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

৬ই অক্টোবর, ২০২২ইং, ২১শে আশ্বিন, ১৪২৯বাংলা

শরতের শুভ্রতা ও প্রাণের সজীবতা

- Advertisement -

নিজস্ব প্রতিবেদকসুখবর বাংলা: বিস্তীর্ণ সবুজ আর  বিশাল নীলাকাশ। ঝকঝকে নীল আকাশের বুকে ধবধবে সাদা মেঘের ভেলা। মনে হয় শ্বেত বসনা এক ঝাঁক তরুণী যেন নৃত্য করছে। নানাবিধ ফুলের শোভা আর শস্যের শ্যামলতা।

চারদিকে সজীব গাছপালার ওপর বহে যাওয়া মৃদুমন্দ বায়ু, শিউলী, কামিনী, হাসনাহেনা, দোলনচাঁপা,  বেলী,  ছাতিম, বরই,  শাপলা, জারুল, রঙ্গন, টগর, রাধাচূড়া, মধুমঞ্জুরি, শ্বেতকাঞ্চন, মল্লিকা, মাধবী, কামিনী, নয়নতারা, ধুতরা, কল্কে, স্থলপদ্ম, কচুরী, সন্ধ্যামণি, জিঙে, জয়ন্তীসহ নাম না জানা নানা জাতের ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করা বাতাস, চারপাশের শুভ্রতার মাঝে বৃষ্টির ফোঁটা, বৃষ্টিশেষে আবারো রোদ, দিগন্তজুড়ে সাতরঙা হাসি দিয়ে ফুটে ওঠা রংধনু।  এ দৃশ্য শুধু এক ঋতুতেই চোখে পড়ে। সে হল শরৎ শুভ্রতার ঋতু I সবচেয়ে মোহনীয় ঋতু ।

শরৎ এলেই প্রকৃতি হেসে ওঠে প্রাণের সজীবতায়। রঙ, রূপ ও স্নিগ্ধতা নিয়েই হাজির হয় ঋতুরানী শরৎ তাই মৃদু কণ্ঠে মনের অজান্তে গেয়ে  ওঠে –

‘এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি বিছানো পথে/এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ কিরণ রথে/ দলি শাপলা শালুক শত দল এসো রাঙায়ে তোমার পদতল/ নীল লাল ঝড়ায়ে ঢল ঢল এসো অরণ্য পর্বতে’ জাতীয় কবি কাজী নজরুলের এমন কথামালা শরতের সৌন্দর্য্যরে এক মূর্তমান বহিঃপ্রকাশ।

জলহারা শুভ্র মেঘের দল যখন নীল, নির্জন, নির্মল আকাশে পদসঞ্চার করে তখন আমরা বুঝতে পারি শরৎ এসেছে। শরতের কাশফুলে মুগ্ধ হয় না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কাশফুল নদী তীরে বনের প্রান্তে অপরূপ শোভা ছড়ায়। গাছে গাছে শিউলির মন-ভোলানো সুবাসে প্রকৃতি হয়ে উঠে মায়াময়। শরৎকালে কখনো কখনো বর্ষণ হয়, তবে বর্ষার মতো অবিরাম নয়। বরং শরতের বৃষ্টি মনে আনন্দের বার্তা বয়ে আনে।

শরতের সৌন্দর্য বাংলার প্রকৃতিকে করে তোলে রূপময়। ভাদ্র-আশ্বিন এ দু’মাস শরৎ ঋতু। বর্ষার পরের ঋতু শরৎ। তাই শরতের আগমনে বাংলার প্রকৃতি থাকে নির্মল স্নিগ্ধ । শরতের আকাশের মতো আকাশ আর কোন ঋতুতে দেখা যায় না । শরৎ কালের রাতে জ্যোৎস্নার রূপ অপরূপ। চাঁদের আলোর শুভ্রতায় যেন আকাশ থেকে কল্পকথার পরীরা ডানা মেলে নেমে আসে পৃথিবীতে।

মানুষ মাত্রই শরৎ কালে প্রকৃতির রূপ-লাবণ্য দেখে মোহিত না হয়ে পারেনা। তাইতো প্রকৃতির এমন রূপের বাহারে কবি-সাহিত্যিকের মনোজগত ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ মেতে ওঠে। প্রকৃতির অমিয় ধারা সাধারনে সঞ্চারিত করতে সৃষ্টি করেন নতুন নতুন সাহিত্য কর্ম।

আর তাই শারদসম্ভার নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ। চর্যাপদের পদকর্তা থেকে শুরু করে আজকের তরুণ কবির রচনায় ও শরৎকাল তার নান্দনিক ব্যঞ্জনা নিয়ে উদ্ভাসিত। বৈষ্ণব সাহিত্যেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

বাংলা সাহিত্যের মহীরূহ প্রকৃতি প্রেমিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎ নিয়ে প্রচুর কবিতা-গান রচনার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ ও সুবাসিত করেছেন। তিনি বলেছেন—

“শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি/ছড়িয়ে গেল ছাড়িয়ে মোহন অঙ্গুলি

শরৎ,তোমার শিশির-ধোয়া কুন্তলে/বনের পথে লুটিয়ে পড়া অঞ্চলে

আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি”

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশির ভাগ রচনায় রয়েছে প্রকৃতির জয়গান। তিনি পদ্মায় নৌকা ভ্রমণকালে শরতের ময়ূরকণ্ঠী নীল নির্মল আকাশে শিমুল তুলার মতো শুভ্রমেঘেদের দল বেঁধে  ছুটে বেড়ানো দেখে লিখেছিলেন—
“অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া/দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরনী বাওয়া I”

শরৎ বন্দনায় এগিয়ে রয়েছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি তার অসংখ্য গান ও কবিতায় শরতে বাংলার প্রকৃতির নিখুঁত আল্পনা এঁকেছেন।তার ‘শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ রাতের বুকে ঐ’, ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক ’সহ অনেক গানই শরৎ-প্রকৃতির লাবণ্যময় রূপ নিয়ে হাজির রয়েছে।

বাঙলা সাহিত্য জগতে মহাকবি কালিদাস ‘মেঘদূত’ কাব্যের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন Iমহাকবি কালিদাস শরৎ বন্দনায় ও ছিলেন অগ্রবর্তী।

তিনি বলেন-“প্রিয়তম আমার, ঐ চেয়ে দেখ, নব বধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরৎ কাল সমাগত।’ কবি ‘ঋতুসংহার’ কাব্যে শরৎ কাল বিষয়ে লিখেছেন—‘কাশ ফুলের মতো যার পরিধান, প্রফুল্ল পদ্মের মতো যার মুখ, উন্মত্ত হাঁসের ডাকের মতো রমণীয় যার নূপুরের শব্দ, পাকা শালি ধানের মতো সুন্দর যার ক্ষীণ দেহলতা, অপরূপ যার আকৃতি সেই নব বধূর মতো শরৎকাল আসে I” কবি কল্পনায় শরতের সাথে প্রকৃতি ও নারীর এই উপমা দেখে বিস্ময়াভিভূত না হয়ে উপায় নেই।

শরতের আরেকটি উল্লেখ যোগ্য দিক হলো—এ সময় মাঠ জুড়ে থাকে সবুজ ধানের সমারোহ। ধানের কচিপাতায় জমা হওয়া শিশিরের ওপর প্রভাতের তরুণ আলো মুক্তার মতো দ্যুতি ছড়ায়। আমাদের দেশের কৃষকরা নবান্নের আশায় দিন গোনে।

আর বাঙালির সার্বজনীন প্রাণের উৎসব, হিন্দু সম্প্রদায়ের শারদীয় দূর্গাউৎসবের কথা বলাই বাহুল্য। শরৎকাল শারদীয় আরাধনায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের যেমন উৎসব মুখর করে, তেমনি বিজয়ার বেদনায়ও করে তোলে ব্যথিত। শরৎ বাঙলার প্রকৃতিতে আসে শুভেচ্ছা স্মারক হিসেবে, নানা মাত্রিক আনন্দের বারতা নিয়ে।  কবি বিনয় মজুমদার শরতের একটি চিত্র এঁকেছেন—

“শরতের দ্বিপ্রহরে সুধীর সমীর-পরে জল-ঝরা সাদা সাদা মেঘ উড়ে যায় ;
ভাবি,এক দৃষ্টে চেয়ে, যদি ঊর্ধ্ব পথ বেয়ে শুভ্র অনাসক্ত প্রাণ অভ্র ভেদি ধায়!”

শরৎ প্রকৃতিকে অপরূপ রূপে সাজিয়ে যায় যার আবেশে অতি সাধারন মানুষ ও ভাবাবেগে আপ্লুত হয়।শরৎ অবসাদগ্রস্ত মনেও নতুন প্রেরণার সঞ্চার করে।তাই তো আমরা প্রকৃতিতে দেখি, এই ঋতুতে কি অপূর্ব রঙের খেলা, কি অপরূপ রঙিন ভুবন সাজায় প্রকৃতি। শরতে প্রাণবন্ত রূপ নিয়ে হেসে ওঠে গ্রাম বাংলার বিস্তৃত দিগন্ত।

আরো পড়ুনঃ

গাঢ় লিপস্টিক ব্যবহারে কি ঠোঁট কালো হয়?

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ