Monday, May 16, 2022
Monday, May 16, 2022
HomeLatest Newsরাজনীতির জন্য নতুন বার্তা দিল নাসিক নির্বাচন

রাজনীতির জন্য নতুন বার্তা দিল নাসিক নির্বাচন

danish

তাপস হালদার:

গত ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনের দিকে সারা দেশের সব মহলেরই চোখ ছিল। নির্বাচনটি স্থানীয় সরকারের একটি নির্বাচন হলেও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সরকার, বিরোধী দল ও নির্বাচন কমিশন প্রত্যেকের জন্যই ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জ।

এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা মার্কার প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নির্বাচিত হয়েছেন। রিটার্নিং অফিসারের ঘোষিত বেসরকারি ফল অনুযায়ী মোট ১৯২টি কেন্দ্রে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ৯৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার পেয়েছেন ৯২ হাজার ৫৬২ ভোট। দুই প্রার্থীর ভোটের পার্থক্য ৬৬ হাজার ৫৩৫টি।

ডা. আইভী ২০১১ ও ২০১৬ সালের নির্বাচনেও সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। তার আগে বিলুপ্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায়ও ২০০৩ সালে মেয়র নির্বাচিত হয়ে ২০১১ সাল পর্যন্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। একটানা তিনি ১৮ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। এতদিন দায়িত্ব পালন করলে যে ধরনের অভিযোগ থাকার কথা ডা. আইভীর সেটি নেই। দুর্নীতি তাকে কখনোও স্পর্শ করেনি। এটি অন্য রাজনীতিবিদদের জন্য একটি শিক্ষা হতে পারে।

নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ হলো আওয়ামী লীগ। এখানে একদিকে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, অন্যদিকে স্থানীয়  সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। স্বাধীনতার পর থেকে চুনকা পরিবার ও ওসমান পরিবারের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। নির্বাচন আসলেই এই দু-পরিবারের বিরোধ নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগকে অস্বস্তিতে ফেলে। নাসিক নির্বাচনে প্রতিবারই ডা. আইভীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে বেশি আলোচনায় থাকে ওসমান পরিবার। তার প্রতিপক্ষ হয়ে উঠে নিজ দলের মধ্যেই একটি পক্ষ। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ আইভী বিরোধী হিসেবে পরিচিত। এবার দল কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করেছে যেন কোনও ভাবেই বিদ্রোহীরা মাথা চাড়া দিতে না পারে। কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বিষয়টি শক্তভাবে দেখা হয়েছে। কেউ যাতে আইভীর বিরোধিতার নামে নৌকাকে পরাজিত করতে না পারে; সে বিষয়ে দল কঠোর মনোভাব পোষণ করেছে।

সুশীল সমাজের কিছু জ্ঞানপাপীরা ডা. আইভীকে এমনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে যে, নৌকা প্রতীকই তার জন্য কাল হতে পারে। কিন্তু আইভী তাদের সে ফাঁদে পা দেননি। তিনি সব সময়ই বলেছেন, তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে থাকবেন। বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনার আদর্শ ধারণ করবেন। নৌকা প্রতীক পেয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বার বার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। আইভী নির্বাচনের মাঠে বলেছেন, নৌকা প্রতীকই তার শক্তি। গত নির্বাচনে যেহেতু নৌকা প্রতীক নিয়েই নির্বাচিত হয়েছিলাম, এবারও আমি নৌকা নিয়েই জিতব।

দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের একটি সুযোগ ছিল নাসিক নির্বাচন। ইউপি নির্বাচনে যেভাবে নৌকার প্রার্থীদের পরাজয় হচ্ছিল, তাতে করে আওয়ামী সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের শংকা কাজ করেছিল। আওয়ামী লীগও টানা ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে। সঠিক ও যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিলে আওয়ামী লীগ যে বিজয়ী হবে, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন তার একটি বড় প্রমাণ।

বিএনপি যে ভুলের বৃত্তে আবর্ত আছে, নাসিক নির্বাচন তার আরেকটি বড় প্রমাণ। বিএনপি ঘোষণা করেছিল দলগতভাবে তারা আর কোনও নির্বাচনে যাবে না, তবে কেউ যদি স্বতন্ত্র নির্বাচন করে সে ক্ষত্রে বাধা দিবে না। সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি নেতারা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করছেন, কোথাও কোথাও তারা জয়ীও হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জে বিএনপি একটু কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল। খন্দকার তৈমুর আলমকে দল থেকে অব্যাহতি দিয়ে একদিকে বলবে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করছে, অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে যেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ভোট টানতে পারে তার জন্য সুযোগ করে দিয়েছে। তাদের সে আশা পূর্ণ হয়নি বলে তৈমুর আলমকে বলি দেয়া হয়েছে, দল থেকে বহিস্কার করেছে। তবে তৈমুর আলম লড়াই করেছেন, ৯২ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়েছেন, যা গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ।

আওয়ামী লীগ বিদ্রোহীদের প্রতি অতীতে এত কঠোর হতে কখনো দেখা যায়নি। নৌকার পক্ষে কাজ না করায় নির্বাচনের আগেই ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ ও মহিলা লীগের কমিটিও বাতিল করা হয়েছে। যা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের জন্য কঠিন সতর্কবার্তা।

ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে। এটাই ছিল তাদের শেষ নির্বাচন। কমিশন প্রমাণ করেছে, যদি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয় তাহলেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হয়। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে রাজনৈতিক দলগুলোর যে দায়িত্ব আছে সেটা এ নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে।

নাসিক নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক বার্তা দিয়েছে। এই নির্বাচনটি ছিল স্মরণকালের সবচেয়ে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন। সরকারের অতি সমালোচকও সেটি স্বীকার করবে। এই নির্বাচনী ফলাফল প্রমাণ করলো, নির্বাচনে জিততে হলে দলগুলোকে সৎ, যোগ্য প্রার্থী বাছাই করতে হবে। নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে হলে জনগণকেই এগিয়ে আসতে হবে। আর আওয়ামী লীগ যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে তাদেরকে পরাজিত করা অত্যন্ত কঠিন। সেটাও তো প্রমাণিত হয়েছে।

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

ইমেইল: haldertapas80@gmail.com

আরো পড়ুন:

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments