spot_img
31 C
Dhaka
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

৭ই অক্টোবর, ২০২২ইং, ২২শে আশ্বিন, ১৪২৯বাংলা

‘রমা চৌধুরী’ হার না মানা এক মায়ের গল্প

- Advertisement -

নিজস্ব প্রতিবেদক, সুখবর বাংলা: মুক্তিকামী বাংলার মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী একজন জননী,পাকিস্তানি হানাদারের হাতে সন্তান-সম্ভ্রম-ভিটেমাটিহারা একজন সর্বংসহা। বাংলাদেশের সৃষ্টির পেছনে যে ক’জন বীরাঙ্গনার সম্ভ্রমহানির ইতিহাস জড়িয়ে আছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম রমা চৌধুরী ।

যিনি তাঁর সর্বস্ব দিয়ে বাংলাদেশটা আমাদের কাছে উপহার দিয়ে গেছেন। যে জাতীয় পতাকা আজ বঙ্গ ভুমিতে পত পত করে উড়ছে, যা নিয়ে আমাদের গর্ব সেই জাতীয় পতাকার মাঝে অন্তর্নিহিত হয়ে আছে তাঁর গল্প। মাত্র ১০:৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের আয়তক্ষেত্রাকার গাঢ় সবুজ  আর মাঝখানে লাল বৃত্তের জাতীয় পতাকার মধ্যে লুকিয়ে আছে রমা চৌধুরী।

‘একাত্তরের জননী’সহ ১৮টি গ্রন্থের লেখক, মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতনের শিকার নারী রমা চৌধুরী আমাদের সবার মা,বাংলাদেশের মা ।

১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র তিন বছর বয়সে পিতাকে হারান। মা মোতিময়ী চৌধুরী শত বাধার মধ্যেও তাঁকে পড়াশোনার জন্যে অনুপ্রেরণা দিয়ে যান এবং মায়ের অনুপ্রেরণায় ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছিলেন।

তাঁর জন্ম অন্য সাধারণ নারীদের মতো হতে পারতো, স্বামী সংসার, সন্তান-সন্ততি নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে দিন পাড় করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। মাত্র ২০ বছর বয়সে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ এক যুগের উপরে তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে চলতে চলতে তিনি বৈবাহিক জীবনে আবদ্ধ হন। ১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন তিনি চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বিদুগ্রাম উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবেই কর্মরত ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ যখন রমা চৌধুরীর সামনে মূর্তিমান আতংক হয়ে দাঁড়ায়। এই সময় তাঁর স্বামী তাঁকে ছেড়ে দেশান্তরী হয়ে যান। সাগর আর টগর দুই সন্তানকে নিয়ে রমা চৌধুরী পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়ায় থাকা শুরু করেন। ১৩মে সকালবেলা, পোপাদিয়ায় স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা রমা চৌধুরীর বাড়িতে আক্রমণ চালায়। সেদিন পাকিস্তানি এক সৈনিক তাঁর সম্ভ্রম কেড়ে নেন। তাঁর উপর চালায় শারীরিক নির্যাতন।

ওই বিভীষিকার বর্ণনা তিনি নিজেই তাঁর “একাত্তরের জননী” বইয়ে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। সেখানে লিখেছেন, ‘যখন আমাকে নির্যাতন করতে উদ্যত হলো পাক সেনা, তখন জানালার পাশে দাঁড়ানো আমার মা ও দুই ছেলে বারবার আকুতি করছিলেন। ছিল আমার পোষা বিড়াল কনুও। তখন আমি মাকে আমার সন্তানদের নিয়ে সরে যেতে বলেছিলাম।’

সম্ভ্রম হারানোর পর রমা চৌধুরী পাকিস্তানি দোসরদের হাত থেকে পালিয়ে পুকুরে নেমে আত্মরক্ষা করেছিলেন। হানাদাররা তাঁকে না পেয়ে গানপাউডার দিয়ে ঘরবাড়িসহ যাবতীয় সহায় সম্পদ সবকিছুই পুড়িয়ে দেয়। ঘরবাড়ি সহায় সম্বলহীন বাকি আটটি মাস তিনি দুইপুত্র সাগর, টগর আর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে জলে-জঙ্গলে লুকিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে পাড় করেছেন।

পোড়া ভিটায় কোনোরকমভাবে পলিথিন আর খড়কুটো মাথায় আর গায়ে দিয়ে রাত কাটিয়েছেন। এইভাবে বহু কষ্টে যুদ্ধের দিনগুলো পাড় করেন।

মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে তাঁর ছেলে সাগর ছিল সাড়ে পাঁচ বছরের। দুরন্ত সাগর মিছিলের পেছনে পেছনে ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা’ বলে ছুটে বেড়াত। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে একসময় সাগর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর মারা যায়।

সাগরের মৃত্যুর ১ মাস ২৮ দিনের মাথায় ৩ বছরের ‍টগরও মারা যায়। ছেলেদের হিন্দু সংস্কারে না পুড়িয়ে তিনি মাটি চাপা দেন। দুই সন্তানের দেহ মাটিতে আছে বলে রমা চৌধুরী জুতা পড়া বন্ধ করে দেন। ছেলেদের মৃত্যুর স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বলে তাঁর কাছে। খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় তাঁর পায়ে ঘা হয়ে যায়।

আত্মীয়স্বজনদের জোরাজুরিতে তিনি অনিয়মিতভাবে তখন জুতা পড়া শুরু করেন। দ্বিতীয় সংসারের ছেলে টুনু ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। টুনুর মৃত্যুর পর রমা চৌধুরী একেবারের মতো জুতা ছেড়ে দেন।

যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তিনি লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তাঁর জীবনজীবিকা। গত ২০ বছর ধরে লেখ্যবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। যদিও তাঁর লেখ্যবৃত্তির পেশা একেবারেই স্বনির্বাচিত এবং স্বতন্ত্র। তিনি প্রথমে একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। বিনিময়ে সম্মানীর বদলে পত্রিকার পঞ্চাশটি কপি পেতেন। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তাঁর জীবনজীবিকা।

রমা চৌধুরী নিজেই নিজের বই ফেরি করে বিক্রি করতেন। এ থেকে প্রতি মাসে তাঁর হাজার বিশেক টাকার মতো আয় হত। এ দিয়েই তিনি থাকা খাওয়ার সংস্থান করতেন।

একই সঙ্গে পরিচালনা করছেন ‘দীপংকর স্মৃতি অনাথালয়’ নামে একটি অনাথ আশ্রম । প্রচণ্ড কষ্টের জীবন কাটলেও তাঁর দু’চোখে স্বপ্ন সুখ সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে অনাথ আশ্রম খুলতে চান। সকল ধর্মের অনাথরা সেখানে থাকবে। মনুষ্য দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে তারা কর্মজীবনে প্রবেশ করবে।

তবে ওই সময়ে তাঁর সমস্ত বইয়ের প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকন ছায়াসঙ্গী হিসেবে সবসময়ই তাঁর পাশে থেকেছেন। প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে বর্তমানে তিনি নিজের ১৮টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে ‘রবীন্দ্রসাহিত্যে ভৃত্য’, ‘নজরুল প্রতিভার সন্ধানে’, ‘স্বর্গে আমি যাব না’, ‘চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবনদর্শন’, ‘শহীদের জিজ্ঞাসা’, ‘নীল বেদনার খাম’, ‘সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘ভাববৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহে রমা চৌধুরী তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে  দেখা করেননি, দেখা করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনার সঙ্গে। খালি পায়ে তার সাথে সাক্ষাতে নিজের কষ্টের কথা জানান।

প্রধানমন্ত্রী আর্থিক সহযোগিতা করতে চাইলে রমা চৌধুরী বিনয়ের সঙ্গে তা ফিরিয়ে দেন। জীবনের দীর্ঘ সময় পাড় করে ফেলেছেন এখন এই আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে তিনি কিইবা করবেন তাই কোনো ধরনের আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণ করেননি।

তিনি কখনো কারো দান দক্ষিণা গ্রহণ করেন নি, নিজের কষ্টের কথা কাউকে মুখ ফুটে বলেনও নি, নিজের জীবনের সর্বস্ব হারিয়েও একা দীপ্তিময় ভূমিকায় পার করেছেন সমস্ত জীবন। যুদ্ধদিনের বিভিন্ন ঘটনা সহ অসংখ্য ইতিহাসের সাক্ষী তিনি, তিনি আমাদের মহান রমা চৌধুরী।

রমা চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাড়ের ব্যথাসহ নানা রোগে ভুগছিলেন। হঠাৎ করে বাসায় পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙে গিয়েছিল তাঁর। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি , অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়।৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ সালে রাত ১০টায় তাঁকে সেখানে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয় এবং ভোররাত ৪টা ৪০ মিনিটে রমা চৌধুরীর লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বোয়ালখালীর গ্রামের বাড়িতে রমা চৌধুরীকে সমাহিত করা হয়।

রমা চৌধুরী জীবনের সকল সুসময় কেড়ে নিয়েছি বাংলার মুক্তিসংগ্রাম । তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই কিন্তু নিজের পরিবারের সামনে সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়ে আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন এ স্বাধীন সার্বভৌম অখন্ড বাংলাদেশ ।তিনি যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন। ভাল থাকুন আমাদের মা, আমাদের একাত্তরের জননী ‘রমা চৌধুরী’ ।

এসি/

আরো পড়ুন:

আকবর আলি খান: একজন উন্নয়নযোদ্ধার আদ্যোপান্ত

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ