spot_img
18 C
Dhaka

৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ইং, ২৩শে মাঘ, ১৪২৯বাংলা

বৈষ্ণব ধর্মে নিত্যানন্দ প্রভু

- Advertisement -

ধর্ম ও জীবন ডেস্ক, সুখবর ডটকম: ভারতীয় ভক্তি আন্দোলনের ধারায় বৈষ্ণবীয় ভক্তিপ্রবাহ এক গুরুত্বপূর্ণ শাখা। সেই বৈষ্ণব ধর্মের মানুষের কাছে এক অপরিহার্য নাম নিত্যানন্দ প্রভু। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের অন্যতম প্রধান পার্ষদ ছিলেন তিনি। বৈষ্ণব মতে, চৈতন্য যেমন কৃষ্ণের অবতার, তেমনি নিত্যানন্দ প্রভু হলেন বলরামের অবতার। তাঁকে মহাপ্রভুর দ্বিতীয় দেহ মনে করা হয়।

‘হরিনাম-সংকীর্তন’-এর মাধ্যমে ভগবান কৃষ্ণের পবিত্র নাম চতুর্দিকে প্রচারের কাজে চৈতন্যদেবের অন্যতম প্রধান সহযোগী ছিলেন নিত্যানন্দ। নৃত্য-সহযোগে হরিনাম কীর্তন করে বেড়াতেন তিনি। চৈতন্য এবং নিত্যানন্দ যেন অভেদাত্মা। বৈষ্ণব আচার্যদের মতে, নিত্যানন্দের আশ্রয় না নিয়ে কেউ মহাপ্রভুর কাছে যেতে বা তাঁকে বুঝতে পারে না। মহাপ্রভু এবং তাঁর ভক্তদের মধ্যে নিত্যানন্দ ছিলেন মধ্যস্থতাকারী।

প্রায় কুড়ি বছর বিভিন্ন তীর্থ পরিভ্রমণের পরে নবদ্বীপে এসেছিলেন তিনি৷ এছাড়াও তীর্থ ভ্রমণকালে তিনি ঈশ্বরপুরী, ব্রহ্মানন্দ পুরীদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। একদা কুখ্যাত জগাই-মাধাইয়ের অভূতপূর্ব পরিবর্তনের নেপথ্যে মূল কাণ্ডারি কিন্তু ছিলেন তিনিই। তাঁরই জন্য মহাপ্রভু বৃন্দাবনের বদলে পুরীতে অবস্থান করতেন। ভক্তদের সামনে অনেক অকল্পনীয় অভাবনীয় লীলা প্রদর্শনের মাধ্যমে নিত্যানন্দ প্রভু তাঁদের এক অতীন্দ্রিয় আনন্দের সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছেন বারংবার। তাঁর করুণাতেই ষড় গোস্বামীর একজন রঘুনাথ দাস, পানিহাটিতে দণ্ড মহোৎসবের সূচনা করেন।

আনুমানিক ১৪৭৪ সালে বীরভূম জেলার অন্তর্গত কাটোয়ার পশ্চিমদিকে একচক্রা (বর্তমানে বীরচন্দ্রপুর নামে পরিচিত) নামক গ্রামে এক ধার্মিক বাঙালি ব্রাহ্মণের ঘরে নিত্যানন্দের জন্ম হয়। সেই গ্রামে গর্ভাবাস নামে নিত্যানন্দের জন্মস্থান রয়েছে আজও। নিত্যানন্দের বাবা হাড়াই পন্ডিত দরিদ্র হলেও দেব-দ্বিজে তাঁর প্রবল ভক্তি ছিল। গ্রামের সকলে বেশ মান্যগণ্যও করত তাঁকে। নিত্যানন্দের মায়ের নাম পদ্মাবতী দেবী। তাঁদের পদবি আসলে ছিল ওঝা।

বাবা-মা ছোটবেলায় নিত্যানন্দের নাম রেখেছিল কুবের। তাঁদের আর্থিক অবস্থার নিরিখে বিচার করলে এই নাম ঠিক মানানসই নয়, তবে অন্তরের অমূল্য সম্পদে ঐশ্বর্যশালী ছিলেন নিত্যানন্দ। তিনি ‘নিতাই’ নামেও পরিচিত ছিলেন জনসাধারণের কাছে। নিত্যানন্দ যখন মাতৃগর্ভে তখন তাঁদের বাড়িতে একজন ঋষি এসেছিলেন। তিনি গর্ভবতী পদ্মাবতীকে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন।

সেই ছদ্মবেশী ঋষি ছিলেন আসলে গর্গ মুনি। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, পদ্মাবতীর গর্ভে বলরাম ফের আবির্ভূত হবেন ধরণীতে। নিত্যানন্দকে বলরামের অবতার বলেই মনে করে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ। যে দুর্ভিক্ষ, খরায় জেলার মানুষ প্রচণ্ড অসুবিধার মধ্যে কাটাতেন, নিত্যানন্দের জন্মের পর নাকি সেসব অঞ্চলে শুভদিন ফিরে এসেছিল। ছোটবেলাতে তিনি কৃষ্ণ এবং রামের কাহিনীগুলির অভিনয় করতে পছন্দ করতেন।

রামকাহিনীতে তাঁর প্রিয় চরিত্র ছিল লক্ষ্মণ। শৈশবে কাদা দিয়ে বাসুদেব, কৃষ্ণ, কংসদের মূর্তি তৈরি করে কৃষ্ণলীলার খেলা খেলতেন তিনি৷ কোনও মেলাতে গিয়ে অন্য সমস্ত খেলনা ছেড়ে দিয়ে রাধা-কৃষ্ণর যুগলমূর্তি কিনে আনতেন নিত্যানন্দ। কোনও দেবস্থানে গিয়ে সব কিছু মনোযোগ সহকারে খুঁটিয়ে দেখতেন তিনি সেই ছোট থেকেই। সহজেই বোঝা যায় শৈশব থেকেই তাঁর ভিতরে ঈশ্বরানুরাগী এক মন তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

বারো বছর নিত্যানন্দ একচক্রা গ্রামে ছিলেন। যখন তাঁর তেরো বছর বয়স তখন এক ভ্রাম্যমাণ সন্ন্যাসী এসেছিলেন তাঁদের বাড়িতে৷ হাড়াই পণ্ডিত এবং নিত্যানন্দ প্রভু সেই অতিথি সন্ন্যাসীর যথাসাধ্য আপ্যায়ন করেন, আতিথেয়তার কোনও ত্রুটি রাখেন না। হাড়াই পণ্ডিত জানান, সন্ন্যাসী যা ইচ্ছে করেন তাই দেওয়ার জন্য তিনি প্রস্তুত আছেন। তবে সন্ন্যাসীর ধন-সম্পত্তির বাসনা ছিল না।

নিত্যানন্দের ভক্তি ও সেবায় মুগ্ধ হয়ে সেই সন্ন্যাসী নিতাইকেই তাঁর ভ্রমণ সঙ্গী হিসেবে চেয়েছিলেন হাড়াই পণ্ডিত এবং পদ্মাবতীর কাছে। বৈদিক সংস্কৃতি দ্বারা আবদ্ধ হওয়ার ফলে নিতাইয়ের বাবা-মা সাধুর অনুরোধ প্রত্যাখান করতে পারেননি। সেই সন্ন্যাসীর সঙ্গে বাবা-মায়ের কোল খালি করে কৈশোরকালেই নিত্যানন্দ প্রভু ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছিলেন। এরপর প্রায় কুড়ি বছর সেই সন্ন্যাসীর সঙ্গে ভারতবর্ষের প্রায় সমস্ত তীর্থস্থান পরিভ্রমণ করেছিলেন তিনি। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবও এত তীর্থস্থান ভ্রমণ করেননি।

ঠিক কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় যুদ্ধ থেকে দূরে থেকে বলরাম যেমন ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান ভ্রমণ করেছিলেন, নিত্যানন্দের এই তীর্থভ্রমণের সঙ্গে সেই ঘটনার সাদৃশ্য লক্ষ্যণীয়। গয়া, কাশী, মথুরা, গোবর্ধন, হস্তিনাপুর, দ্বারকা, অযোধ্যা, হরিদ্বার প্রভৃতি আরও অনেক পবিত্র স্থানে ভ্রমণ করেছিলেন নিত্যানন্দ। পাণ্ডারপুরে (বর্তমান মহারাষ্ট্র) নিত্যানন্দ সাধু গুরু লক্ষ্মীপতি তীর্থের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

বলরামের স্বপ্ন দেখেছিলেন লক্ষ্মীপতি এবং তারপর যখন নিত্যানন্দকে দেখেন তখন একেবারে নিশ্চিত হয়ে যান যে, এই পুরুষই স্বয়ং বলরাম। কথিত আছে লক্ষ্মীপতির কাছেই দীক্ষাগ্রহণ করেছিলেন নিত্যানন্দ। তবে অনেকেই এই মত স্বীকার করেন না। বদরিকাশ্রমে শ্রীল ব্যাসদেবের আশ্রমে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন তিনি। এছাড়াও লক্ষ্মীপতির শিষ্য মহান কৃষ্ণভক্ত মানবেন্দ্র পুরী, অদ্বৈতাচার্য, ঈশ্বরপুরী, ব্রহ্মানন্দ পুরীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন নিত্যানন্দ প্রভু। মাধবেন্দ্র পুরী এবং তাঁর শিষ্যদের সান্নিধ্যে থেকে বেশ কিছুকাল কৃষ্ণকথার রসাস্বাদন এবং তৎজনিত আনন্দ উপভোগ করেছিলেন নিত্যানন্দ।

তীর্থে তীর্থে ভ্রমণ করতে করতে শেষ পর্যন্ত বৃন্দাবন এবং অবশেষে  কৃষ্ণসন্ধানে নবদ্বীপে এসে উপস্থিত হন নিত্যানন্দ। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য ইতিপূর্বেই নবদ্বীপে হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে কৃষ্ণপ্রেম বিতরণের কাজ শুরু করেছিলেন। নিত্যানন্দ ১৫০৬ সালে মহাপ্রভুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তখন নিত্যানন্দের বয়স ৩২ এবং শ্রীচৈতন্য সবে ২০। সেই সাক্ষাতের ঘটনাও ছিল অদ্ভুত।

কথিত আছে, নবদ্বীপে এসে নিত্যানন্দ নন্দনাচার্যের বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। বিচ্ছেদের মধ্যে দিয়ে মিলনের আনন্দ দ্বিগুণভাবে উপভোগের বাসনা ছিল তাঁর। সেসময় একদিন রাতে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য স্বপ্ন দেখলেন রথে চড়ে কে একজন আসছেন এবং তাঁর রথের চূড়ার ধ্বজায় এক তালগাছ। এও দেখলেন যে, সেই ব্যক্তি অনুসন্ধান করছেন নিমাই পণ্ডিতের বাড়ি।

তখনই তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন এক মহান ব্যক্তি নবদ্বীপে এসে উপস্থিত হয়েছেন। তখন তাঁর দুই ভক্ত হরিদাস ঠাকুর এবং শ্রীবাস পণ্ডিতকে নিত্যানন্দের অনুসন্ধানের জন্য পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা দুজন নন্দনাচার্যের বাড়ির বারান্দায় দিব্য কান্তির অধিকারী, সুঠাম বলশালী নতুন এক মহাজনের দেখা পান এবং বুঝতে পারেন এই সেই মহাপুরুষ। নিত্যানন্দ বসেছিলেন গেরুয়া বসন পরে এবং বাকি সকলে সাদা।

কেউ একজন শ্রীমদ্ভাগবতের শ্লোক উচ্চারণ করেছিলেন সেখানে, ফলে তাঁর অঙ্গে দিব্য সাত্ত্বিক বিকার প্রকাশ পেতে থাকে ক্রমে ক্রমে। সকলে বুঝতে পারেন যে, নিত্যানন্দ একজন মহান পুরুষ। চৈতন্য এবং নিত্যানন্দের সাক্ষাৎ ও মিলন ভক্তি আন্দোলনের ধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একে অপরকে আলিঙ্গন করে ভাবে বিহ্বল হয়ে অঝোরে কেঁদেছিলেন তাঁরা। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য নিত্যানন্দকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য ব্যাস-পূজার আয়োজন করেছিলেন। যদিও নিত্যানন্দ তার প্রতিবাদ করেন এবং পরিবর্তে মহাপ্রভুরই পূজা করেন তিনি। পরস্পরের প্রতি তাঁদের অতীন্দ্রিয় ভালোবাসা ছিল। দুই দেহ হলেও যেন এক আত্মা, ঠিক যেমন ছিলেন কৃষ্ণ আর বলরাম।

সেসময়ে নবদ্বীপে তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের বেশ প্রতিপত্তি ছিল৷ শক্তি আরাধনা নদীয়ার চতুর্দিকে প্রসার লাভ করেছিল। শ্রীচৈতন্য তখন চারদিকে প্রচার আরম্ভ করলেন যে, কৃষ্ণনামেই সকলের মঙ্গল। কৃষ্ণনাম ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ঘুরে ঘুরে হরিনাম সংকীর্তনের প্রচলন করেন তিনি। এই কৃষ্ণনাম প্রচারকার্যের দায়িত্ব বিশেষ করে মহাপ্রভু প্রদান করেছিলেন হরিদাস ঠাকুর এবং নিত্যানন্দের ওপর। মহাপ্রভুর আদেশে নগরে ঘুরে ঘুরে নৃত্য-সহযোগে হরিনাম সংকীর্তন করে বেড়াতেন তাঁরা। নবদ্বীপের প্রতিটি বাড়িতে ঈশ্বরের প্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

নিত্যানন্দ ছিলেন অপার করুণাময় এক দিব্যপুরুষ। নির্বিচারে প্রেম বিলোতে কার্পণ্য করেননি তিনি কখনও। হয়তো এক্ষেত্রে মহাপ্রভুর চেয়েও নিত্যানন্দকে অধিক করুণাময় মনে হয়। যাদেরকে মহাপ্রভু স্বয়ং নিরাশ করেন, তারাও প্রভু নিত্যানন্দের অপার স্নেহ, করুণার রস থেকে বঞ্চিত হতেন না কখনও।

যে কোনও পতিত, নীচস্বভাব, দুর্জন মানুষও নিত্যানন্দের কাছ থেকে উপেক্ষা পাননি, বরং পরম মমতায়, স্নেহে তাদের কাছে টেনেছেন, উদ্ধার করেছেন কখনও সেই বিপথ থেকে। এই প্রসঙ্গে জগাই-মাধাইয়ের উদ্ধারের ঘটনা স্মর্তব্য। জগাই ও মাধাই ছিলেন তৎকালে নবদ্বীপের ব্রাহ্মণ বংশজাত দুই কুখ্যাত বিপথগামী দুরাচারী। তাদের অত্যাচারে নবদ্বীপবাসীর শান্তি ছিল না।

সেই অনাচার সৃষ্টিকারী দুই পাষণ্ড জগাই মাধাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল নিত্যানন্দের। তখন এই দুই পতিত আত্মার প্রতি সমবেদনা অনুভব করেছিলেন তিনি এবং কৃষ্ণনাম ও মহাপ্রভুর মহিমা প্রচারের জন্য তাদের উদ্ধারের সঙ্কল্প করেন। সেই হেতু জগাই-মাধাইকে কৃষ্ণনাম জপ করতে বলেন নিত্যানন্দ ও কৃষ্ণ চেতনার মিষ্টি অমৃত আস্বাদনের অনুরোধ করেন। কিন্তু একথা শুনে দুই দস্যু নিত্যানন্দ এবং হরিদাসকে তাড়া করে আসে, চিৎকার করে অশ্লীল নামে ডাকতে থাকে, এমনকি মাধাই রাগবশত একটি মাটির ভাঙা পাত্র ছুঁড়ে মারলে তা নিত্যানন্দকে আঘাত করে এবং রক্তপাত ঘটায়।

মহাপ্রভু এই কথা শুনে ক্রোধে সুদর্শন চক্র আহ্বান করলে নিত্যানন্দ তাঁকে নিরস্ত করেন এবং মনে করিয়ে দেন এই অবতারে অস্ত্রধারণ করা চলবে না। অপার করুণায় মহাপ্রভুর ক্রোধ থেকে জগাই-মাধাইকে রক্ষা করেন তিনি। এত কৃপা ও করুণা দেখে জগাই-মাধাইয়ের মনে পরিবর্তন শুরু হয় এবং অবশেষে নিত্যানন্দ তাদের মহান ভক্তে রূপান্তরিত করে দেন। পতিত উদ্ধারের এমন বহু ঘটনা নিত্যানন্দের জীবন ঘাঁটলে দেখতে পাওয়া যাবে।

চৈতন্যের আদেশে একবার পানিহাটি গিয়েছিলেন নিত্যানন্দ কৃষ্ণনাম প্রচারের জন্য। সেখানে রঘুনাথ দাস তাঁর করুণা লাভ করেছিলেন। রঘুনাথ নিজেকে অযোগ্য মনে করে নিত্যানন্দের কাছে যেতে সংকোচ করছিলেন বলে নিত্যানন্দ নিজেই তাঁকে ডাকেন ও প্রায় জোর করেই রঘুনাথের মস্তকে নিজের চরণপদ্ম স্থাপন করেছিলেন। নিত্যানন্দ প্রভুর আদেশেই পানিহাটিতে দণ্ড মহোৎসবের সূচনা করেছিলেন রঘুনাথ।

দিব্য ভাবোন্মাদে বিভোর হয়ে থাকতেন নিত্যানন্দ। কখনও গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়ে কুমিরের সঙ্গে সাঁতার কাটতেন, কুমিরের মুখ খুলে তাঁদের হরিনাম করতে বলতেন, কখনও সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে শচীমাতার নিকটে গিয়ে হাজির হতেন। ষাঁড়ের পিঠে লাফ দিয়ে চড়ে কখনও বা নিজেকে শিব বলে ঘোষণা করতেন। তবে এসবই জনশ্রুতি। মহাপ্রভু তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বাংলায় গিয়ে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলারস বিতরণ করতে।

কিন্তু নিত্যানন্দ বঙ্গদেশে এসে কৃষ্ণনামের পরিবর্তে দ্বারে দ্বারে গৌরাঙ্গের নাম কীর্তনের উপদেশ দিয়ে বেড়ান। তাঁর মনে হয়েছিল গৌরাঙ্গের নামকীর্তন করলে যেমন সব পাপ-তাপ দূর হবে, তেমনি কৃষ্ণলীলারসও আস্বাদন করা যাবে। ‘যেজন গৌরাঙ্গ ভজে সেই হয় আমার প্রাণরে’— এই বিখ্যাত পংক্তির জন্ম নিত্যানন্দের গৌরাঙ্গলীলা প্রচারের মাধ্যমেই।

চৈতন্য মহাপ্রভু এবং অদ্বৈতাচার্যের সঙ্গে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম, ভক্তি যোগ ইত্যাদি ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন নিত্যানন্দ প্রভু। চৈতন্যদেবের পরামর্শেই বঙ্গদেশে ফিরে কালনার সূর্য্যদাস পণ্ডিতের দুই কন্যা জাহ্নবা ও বসুধাকে বিবাহ করেন নিত্যানন্দ।

একজন সন্ন্যাসী হয়ে বিবাহ করে সংসারধর্মে প্রবেশ করলেন কীভাবে, এ এক সাধারণ প্রশ্ন। আসলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে কৃষ্ণনাম প্রচার করতে হলে সাংসারিক গৃহস্থ মানুষদের মধ্যে থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা প্রয়োজন। সে কারণেই নিত্যানন্দকে বিবাহ করে গার্হস্থ্য জীবনযাপনের পরামর্শ দিয়েছিলেন মহাপ্রভু এবং সমাজের সেই স্তরে কৃষ্ণলীলা প্রচার করতে বলেছিলেন। পরবর্তীকালে জাহ্নবা দেবীর পুত্র বীরচন্দ্র প্রভুও বঙ্গদেশকে নামসঙ্কীর্তনের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন।

নিত্যানন্দ হলেন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের আদি ও সর্বোচ্চ ভক্ত। তাই অনেক বৈষ্ণব ভক্ত পণ্ডিতের মতে, আদিগুরু নিত্যানন্দের সেবা ব্যতিরেকে কখনই কেউ শ্রী গৌরসুন্দরকে সর্বক্ষেত্রে সেবা করতে পারেন না। নিতাইয়ের পাদপদ্মের ছায়ায় আশ্রয় না নিলে রাধাকৃষ্ণের নিকট পৌঁছানো যায় না বলেই মনে করে থাকেন বৈষ্ণবরা। নিত্যানন্দকে কেন্দ্র করে অনেকগুলি গ্রন্থও রচিত হয়েছে। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের ‘নিত্যানন্দচরিতামৃত’, রামরায়াজীর ‘নিত্যানন্দ ভাষ্য’ ইত্যাদি।

পণ্ডিতদের মতে, ১৫৪০ থেকে ১৫৪৪-এর মধ্যে কোনও একসময়ে নিত্যানন্দ প্রভুর মৃত্যু হয়।

এসি/

আরো পড়ুন:

কাশ্মীরে সুফিবাদের ওপর আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত

 

 

 

 

 

 

 

 

 

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ