spot_img
33 C
Dhaka
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ইং, ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৯বাংলা

`বর্ণালীর সাতরঙ’ -সবিতা বিশ্বাস

- Advertisement -

`বর্ণালীর সাতরঙ’

****সবিতা বিশ্বাস

প্রিজম দ্বারা বিশ্লিষ্ট হওয়ার পর যে একাধিক (সাদা আলো বিশ্লিষ্ট হলে সাতটি) বর্ণের আলোর পটি গঠিত হয় তাকেই বর্ণালী বা (Spectrum) বলে |

মুক্তি ম্যাডাম এত ভালো করে পড়াতেন, ক্লাসের পড়া ক্লাসেই বোঝা হয়ে যেত | ক্লাস টেনে পড়ার সময় ভৌতবিজ্ঞানের ক্লাসে  ম্যাডাম বর্ণালী নিয়ে বোঝানোর পরেই প্রথম প্রশ্নটা করেছিলেন বর্ণালী সোমকে | ম্যাডামের পড়ানো খুব ভালো লাগতো যার জন্য ফিজিক্সকে আর ছাড়তে পারলো না বর্ণালী | তারপর ইলেভেন টুয়েলভে পড়ার সময় রজত দাদার কাছে টিউশনি পড়তে যেত |

তখনই ঠিক করে ফেলেছিল মায়ের ইচ্ছে পূরণ করার জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং নয় ওর লক্ষ্য হবে পদার্থবিদ্যা | ততদিনে পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ভিলহেলম কনরাড রনটগেন, স্টিফেন হকিং, পিয়ের কুরি, মেরি কুরি এইরকম সব বিখ্যাত মানুষের জীবনী, কাজ ওর মুখস্ত হয়ে গেছে | মাঝে মাঝে ওর বন্ধু মধুরিমা বলত বর্ণালী তুই কি পদার্থবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করবি? নাকি পদার্থবিদদের নিয়ে গবেষণা করবি?

 

বর্ণালী এখন ডক্টর বর্ণালী সোম, লক্ষ্মীকান্তপুরের একটা কলেজের অধ্যাপিকা | বন্ধুরা বিশেষ করে মধুরিমা হাসাহাসি করে, কিরে ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন থেকে ডক্টরেট, পোস্ট ডক্টরেট করে শেষে ধ্যাড়ধ্যাড়ে গোবিন্দপুর? মধুরিমা ইউ এস এ র কিংস  কলেজে পড়াচ্ছে | ও এ কথা বলতেই পারে! মা, দিদি, আত্মীয়স্বজন কেউই এই সিদ্ধান্তে খুশি নয় | মা বরাবরই একটু বেশি ভাববাদী, উচ্চাকাঙ্খী | এ কথাও ভেবেছিলেন অদূর ভবিষ্যতে মেয়ে নোবেল পাবে | ছোটবেলায় যেভাবে নোবেল প্রাপকদের জীবনী ঠোঁটস্থ ছিল!

 

মানুষের মন কখন যে কোন দিকে মোড় নেয় সে নিজেও জানেনা | ডক্টর বর্ণালী সোম পোস্ট ডক্টরেট শেষ করে শেফিল্ডে পড়াতেও শুরু করেছিলেন | অফার ও পেতে শুরু করেছিলেন ভালো ভালো জায়গা থেকে | ঠিক তখনই একটা ছোট্ট খবর জীবনের গতিপথের মোড় ঘুরিয়ে দিল | বাঙালি বিজ্ঞানি শ্যামাপ্রসাদ ভট্টাচার্য ও সহযোগী আশিস ঘোষ আমেরিকার হাওয়ার্ড ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন |

গবেষণা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ ম্যাথেমেটিক্স এন্ড ইটস এপ্লিকেশন’ পত্রিকায় | গবেষণাপত্রে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সহ গণিতের একটি নতুন থিয়োরিয়াম 1=w102 এবং জ্যামিতির একটা নতুন প্রিন্সিপল (GW or G α A when flat sheet is constant) বিশেষভাবে উল্লিখিত হয়েছে | এই নতুন আবিষ্কৃত থিয়োরিয়াম ও প্রিন্সিপলের সাহায্যে অতি ছোট থেকে বড় আকারের এবং বহু বক্ররেখা বেষ্টিত সমতল ক্ষেত্র পরিমাপ করা সম্ভব হবে | আকস্মিক দুর্যোগের সমযে, ভয়াবহ বন্যা, ভূমিকম্প বা বড় আগুনে পুড়ে যাওয়া অঞ্চল প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি পরিমাপ করা সম্ভব হবে |

বিজ্ঞানী শ্যামাপ্রসাদ বিদেশে যাবার আগে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজের অধ্যাপক ছিলেন | ওই সময়ে অনেক মেধাবী গরীব ছাত্রদের সাহায্য করেছেন | তাদের মধ্যে অনেকেই আজ বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক, গবেষনার কাজে ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে | এই খবরের সঙ্গে সঙ্গে আরো একটি খবর পেলেন ড. বর্ণালী সোম | উনি পড়াকালীন যে কলেজ ন্যাকে A+ গ্রেড পেয়েছিল সেই সাথে পদার্থবিদ্যা বিভাগে ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সেরা, সেই কলেজ আজ তার সব গৌরব হারিয়ে মৃতপ্রায় |

 

সে কারণে ড. সোম লেডি ব্রেবোর্ন নয় বেছে নিলেন এই কলেজকে | দশ বছর বিদেশে থাকাকালীন বেশ মোটা অংকের অর্থ সঞ্চিত হয়েছিল, তার সিংহভাগ খরচ করলেন ল্যাবের আধুনিকীকরণে | একাজে সরকারী ফান্ডের জন্য অপেক্ষা করলেন না |

সঙ্গে পেলেন কলেজের আরো দু’জন প্রফেসরকে, বিশ্বরূপ সেন ও তনিমা মন্ডল | ভালো কাজে যেমন হয়ে থাকে, কানে এল টীকা টিপ্পনি, এইবার এই কলেজে আলবার্ট আইনস্টাইন, আইজ্যাক নিউটন তৈরী হবে! কি হবে তা বলবে আগামী, তাই ওসব কথাকে একেবারেই গুরুত্ব না দিয়ে লেগে পড়লেন কাজে |

 

কিন্তু বিধি বাম | করোনা অতিমারীর আছড়ে পড়া ঢেউয়ে বন্ধ হয়ে গেল স্কুল কলেজ | না, থেমে থাকেননি ড. সোম | প্রিন্সিপাল স্যারের সহযোগিতায় প্রথম থেকেই পড়াতে শুরু করলেন অনলাইনে | কিন্তু যা হয়, এখনো সুন্দরবন এলাকার অধিকাংশ দ্বীপে নেট কানেকশন দুর্বল | তার উপর আবার সকলের কাছে স্মার্ট ফোন ও নেই | কি হবে এখন? অতিমারীর বিদায় নেবার লক্ষণ নেই | ছেলে মেয়েগুলোর ভবিষ্যত কি এভাবেই কালো মেঘে ঢেকে যাবে?

 

বাড়ির লোকদের আপত্তি সত্ত্বেও ড. সোম স্মার্ট ফোন কিনে পাঠিয়ে দিলেন ছাত্র-ছাত্রীদের | এই সুযোগে কয়েকজন দুষ্টু ছাত্র মিথ্যা বলে ফোন নিল এটাও বুঝতে পারলেন তিনি | তারপর কলেজের নিয়ম অনুযায়ী অনলাইনে সপ্তাহের সাতটা ক্লাস ছাড়াও ছোট ছোট গ্রুপ করে ওদের পড়াতে লাগলেন | এইভাবে ওদের মধ্যে থেকে গ্রুপ লিডার নির্বাচন করে তাদের কাছে নিজে ও অন্যরা পাঠ নিলেন |

যখন দেখলেন গ্রুপ লিডার তৈরী তখন তাদের দায়িত্ব দিলেন সময় বার করে কাছের এলাকায় গিয়ে সামাজিক দূরত্ববিধি মেনে পড়ানোর | এই কথাগুলো লেখা যত সহজ বাস্তব প্রয়োগ ঘটানো ততটাই কঠিন | কিন্তু সেই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন ড. সোম | আর এর সবটাই করলেন শিক্ষাদানের আনন্দ থেকে | সেই ছোটবেলাতে যখন রজত দাদার কাছে পড়তেন তখনি দাদা বলেছিলেন, শোন বর্ণালী “শিক্ষা শুধু জীবিকা অর্জনের জন্য নয়, শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য আনন্দ আহরণ” | তুই তো বর্ণালী, তোর মধ্যে যে সাত রং আছে তা ছড়িয়ে দিস, দেখিস চারদিক কেমন ঝলমল করে উঠবে | এই কথাগুলো রজতদা নিজেও মানতেন, তাই অ্যাক্সিডেন্টে একা চলাফেরার শক্তি হারিয়ে ফেললেও শিক্ষাদান থেমে থাকেনি |

 

কিন্তু পদার্থবিজ্ঞান মানে শুধুমাত্র থিয়োরি নয়, বড় অংশ জুড়ে আছে প্র্যাকটিকাল | তার কি হবে? কথায় বলে ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়, হয়ে গেল | ছাত্র ছাত্রীদের টিকাকরণ সমাপ্ত | এইবার তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন, এ কাজে এগিয়ে এল কয়েকটি সংগঠন সহ প্রাক্তনীরা | তবে বিপত্তির শেষ নেই | ঝাঁপিয়ে পড়ল ইয়াস ঝড়, ঘোড়ামারা সহ কয়েকটি দ্বীপের মানুষের জীবন বিপর্যস্ত | তাদের মধ্যে ওঁদের ছাত্র ছাত্রীও আছে | সেসব কিছুটা সামাল দেওয়া গেলেও বেঁকে বসলেন অভিভাবকরা |

আবার কি হয়! ছেলেমেয়েদের কাছ ছাড়া করবেন না | এদের বোঝাতে বেরিয়ে পড়লেন স্বয়ং প্রিন্সিপাল | বিশ্বরূপ, তনিমাকে দেখে এগিয়ে এলেন আরো কয়েকজন | অবেশেষে সবটা না হলেও কিছুটা সফলতা এসেছে | ছাত্ররা কয়েকদিন প্রাক্টিকাল করে ফিরে গেছে বাড়িতে | এখন আগের মত গ্রুপ করে অনলাইন অফলাইনে পড়া চলছে | পরীক্ষার সময় ছাত্রদের বাড়ি গিয়ে খাতা সংগ্রহ করেছেন শিক্ষকেরা | মনে হচ্ছে হৃত গৌরব ফিরে পাবে কলেজ |

 

সব থেকে মজার কথা, যারা ড. সোমের কাজকে ধিক্কার দিচ্ছিলেন, ভীমরতি বলছিলেন এমনকি পাগল বলতেও ছাড়েননি সেইসব কলেজগুলোও আলস্য পরিত্যাগ করে উঠে পড়ে লেগেছে | এটা খুব উপভোগ করছেন ডক্টর | ওনাকে দেখে অন্যরা অনুপ্রাণিত হলে সার্বিকভাবে ছাত্রদের মঙ্গল |

যদিও যখন সামনেটা ঢেকে যায় অন্ধকারে, মানুষের অসহযোগিতায় তখন আঁকড়ে ধরেন রবীন্দ্রনাথকে | নিজেই গেয়ে ওঠেন “বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা / বিপদে আমি না যেন করি ভয় |” আর “বোঝাপড়া” কবিতাটা আওড়ান মন্ত্রের মত | ফিরে পান সব শক্তি, সাহস, এগিয়ে যাবার প্রেরণা |

 

ডক্টর বর্ণালীর কাজের কথা ইতিমধ্যে পত্র পত্রিকা মারফত ছড়িয়ে পড়েছে, বাইরের দেশগুলো তাকে গেস্ট লেকচারার হিসেবে চাইছে | কিন্তু চাইলেই তো হবেনা, বিমান চলাচল বন্ধ যে! তার মধ্যেই ইসরায়েলের ওয়াইজম্যান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের প্রফেসর জন রিচার্ডকে কথা দিয়েছেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কিছুদিনের জন্য যাবেন |

 

ছাত্রদের আলাদা কোনো দেশ, বর্ণভাগে বিশ্বাসী নন প্রফেসর | তেমনি গুরু—গুরুই | তাঁর একমাত্র কাজ শিক্ষাদান করা | একাজে শুধুই আনন্দ | সেই আনন্দকে সঙ্গী করে প্রফেসর ড. সোম বর্ণালীর সাতরঙে উজ্জ্বল করে তুলছেন ছাত্রদের মেধা ও মনন |

—-

শব্দ সংখ্যা—১০৭০

সবিতা রয় বিশ্বাস

৩৩ সুকান্ত সরনী, ইটাগাছা

কোলকাতা।

আরো পড়ুনঃ

গন্তব্য’-সুব্রত পুরু

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ