spot_img
18 C
Dhaka

৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ইং, ২৩শে মাঘ, ১৪২৯বাংলা

পাকিস্তান-আফগানিস্তানে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে যেভাবে জড়ায় মানুষ

- Advertisement -

ডেস্ক রিপোর্ট, সুখবর ডটকম: ২০২২ সালের এপ্রিলে, আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী শারি বালুচ, করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে তিন চীনা ভাষার শিক্ষক এবং একজন পাকিস্তানি ড্রাইভারকে হত্যা করে। শারির শিক্ষিত বাবা-মা এ বিষয়ে তাদের অজ্ঞতা দাবি করে। যদিও তার ডেন্টিস্ট স্বামী প্রথমে টুইটারে তার প্রয়াত স্ত্রীর ক্রিয়াকলাপের জন্য গর্ব প্রকাশ করেছিল, তবে কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেফতার করলে সে তার অবস্থান পরিবর্তন করে নিজেকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে ঘোষণা করে।

শারির ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, করাচির বাসিন্দা এই মহিলা, মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত, ছোট দুই সন্তানের সুখী মা এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য অপেক্ষারত একজন প্রাক্তন শিক্ষক ছিলেন। তার মাঝে সন্ত্রাসবাদের কোনও চিহ্নই ছিল না। তবে কেন এমন একজন মহিলা সন্ত্রাসবাদের দিকে পা বাড়ালেন?

একজন প্রখ্যাত আমেরিকান শিক্ষাবিদ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রবার্ট পেপ, জঙ্গিবাদ এবং যুদ্ধ নিয়ে অনেক আলোচনা করে গেছেন। তার আলোচনাগুলোই এ ব্যাপারে আলোকপাত করবে।

তিনি ১৯৮০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত বিশ্বে মোট ৩১৫ টি আত্মঘাতী সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার একটি বিস্তৃত ডাটাবেস তৈরি করেছিলেন। পেপ ব্যাখ্যা করেছেন যে আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের ইতিহাসে প্রাচীন ইহুদি জেলোটরা রোমান দখলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ৬৬ খ্রিস্টাব্দে। তার মতে, ধর্মনিরপেক্ষ, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী সংগঠন, শ্রীলঙ্কার তামিল টাইগাররা, ইতিহাসের অন্য যেকোনো গোষ্ঠীর চেয়ে বেশি আত্মঘাতী সন্ত্রাসী হামলার জন্য দায়ী।

পেপের যুগান্তকারী কাজ, পশ্চিমা বিশ্বের মুসলিমদেরকে সন্ত্রাসবাদের জন্য দায়ী করার চিন্তাচেতনাকে ভুল প্রমাণিত করে। তবুও ইসলামী বিশ্বেই তার এ কাজ উপেক্ষিত হয়ে রয়ে গিয়েছে।

এরই মধ্যে, পাকিস্তান-আফগানিস্তান দুই দেশে তালেবানদের আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ এবং সন্ত্রাসী হামলা দুই দেশেরই শান্তি ভঙ্গ করছে।

পেপ তার বইতে বলেছেন যে, প্রায় সব আত্মঘাতী সন্ত্রাসী হামলার একটি নির্দিষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ এবং কৌশলগত লক্ষ্য রয়েছে। হামলাগুলো আধুনিক গণতন্ত্রকে সেই অঞ্চল থেকে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করতে বাধ্য করে। ধর্ম এখানে নগণ্য একটি কারণ। যদিও প্রায়শই সন্ত্রাসী সংগঠন তাদের বৃহত্তর উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে ধর্মকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) তার রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলিকে এগিয়ে নিতে, শারি বালুচের দেশপ্রেমিক সত্ত্বাকে ব্যবহার করেছিল।

বেলুচিস্তানের বিএলএ দেশপ্রেমের স্লোগানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দল, টিএলপি বা টিটিপি ধর্মীয় দলের ছদ্মবেশ ধরে আছে এবং তাদের নেতারা হলেন ক্ষমতা লোভী যারা অর্থনৈতিক লাভ চান।

এটি আফগানিস্তানের কৌতূহলী ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে, যেখানে পেপের দ্বারা বর্ণিত বৃহত্তর কৌশলগত উদ্দেশ্য অর্জিত হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি আমেরিকান দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত হয়েছে দেশীয় তালেবানদের হাতে। ২০২১ সালে, তালেবানরা আমেরিকান বাহিনীর কাছ থেকে তাদের দেশ পুনরুদ্ধারের জন্য কাবুলের দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে কোন ধরনের প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়নি এবং তখন থেকেই তারা আফগানিস্তান শাসন করে আসছে। আদর্শগতভাবে, দেশে বিদেশী দখলদারিত্বের অবসান হওয়ায় দেশে শান্তি ফিরে এসেছে।

অন্যদিকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়ে পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদ চালাচ্ছে। টিটিপি পাকিস্তানি পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালাচ্ছে।

টিটিপি-এর প্রধান মুফতি নূর ওয়ালি মেহসুদ, এফএটিএ একীভূতকরণের প্রত্যাবর্তনের দাবি করছেন। তিনি ১৮৮৪ সালের ডুরান্ড লাইনকে অপ্রাসঙ্গিক দাবি করে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তের মধ্যে অবাধ চলাচলের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছেন।

পাকিস্তানের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার জন্য পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী সন্ত্রাসবাদের অবসান ঘটাতে চেষ্টা করে যাচ্ছে।

এটা বুঝতে হবে যে টিটিপি, টিএলপি এবং এই জাতীয় অন্যান্য সংগঠনগুলো ধর্মীয় দল নয়। তারা তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য যা যা করছে তা রাজনৈতিক, নীতিহীন এবং প্রায়শই মানবতা বর্জিত। মাওলানা আব্দুল আজিজ এবং মাওলানা আব্দুল রশিদ গাজীর কাছে ইমাম ই কাবার ইসলামিক বাণীর কোন অর্থ ছিল না। টিএলপি ক্ষমতা লাভের চেষ্টা করেছে এবং এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নারী ও শিশুদের মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে।

যদিও টিটিপি একটি শরীয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রের দাবি করে, তবুও তারা কোন ধর্মীয় সংগঠন নয়। তাদের মূল লক্ষ্য ক্ষমতা দখল করাটাই। ধর্মের মুখোশ পড়ে তারা সন্ত্রাসবাদকে হাতিয়ার বানিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শকে চরিতার্থ করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

গোপনে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র সফলভাবে তার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ইমাম কাবার কুরআনের শিক্ষা সন্ত্রাসবাদের মূল পরিকল্পনাকারীদের বিশ্বাস করবে না। পাকিস্তানি রাষ্ট্রকে আরো সূক্ষ্ম পরিকল্পনা করতে হবে। ইতালীয় নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি এবং আমেরিকান রবার্ট গ্রিনের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপর বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখক উইলিয়াম ডালরিম্পলের লেখা, কীভাবে তারা প্রচুর ধনী, শক্তিশালী এবং পরিশীলিত মুঘল ভারতের বিভিন্ন নবাব এবং মহারাজাদের ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা দেয়।

একটা সময় ছিল যখন ইউরোপ অন্তহীন যুদ্ধ এবং অস্তিত্বের বর্বর অবস্থা নিয়ে অন্ধকার যুগে আটকে ছিল। ১০৯৫ সালে দ্বিতীয় পোপ আরবান এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পান। ক্রুসেডের জন্য সমস্ত বর্বর যুদ্ধবাজদের সমাবেশ করে আন্তঃজাতিক উপজাতীয় যুদ্ধ এবং অবিরাম সহিংসতার অবসান ঘটিয়ে তিনি সফলভাবে ইউরোপীয় ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছিলেন।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তান উভয় দেশেরই বিশেষ অর্থনৈতিক সহায়তা প্রয়োজন। সন্ত্রাসবাদের অবসান ঘটাতে সক্ষম হলে দুইটি রাষ্ট্রই বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্য থেকে লাভবান হতে সক্ষম হবে।

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ