spot_img
27 C
Dhaka

৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ইং, ২৩শে মাঘ, ১৪২৯বাংলা

পাকিস্তানে যেভাবে দিন কাটছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের

- Advertisement -

ডেস্ক রিপোর্ট, সুখবর ডটকম: সারা বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে অনেক ব্যক্তিকে হয়রানি, হুমকি, জেল ইত্যাদির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কারণকে অস্বীকার করেন।

মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিশেষ করে দেশের সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা প্রদান এসব ব্যাপার নিয়ে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই উদ্বিগ্ন ছিল না। গত সেপ্টেম্বরে, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক সাবকমিটি (ডিআরওআই)-এর সদস্যরা পাকিস্তান সরকারকে ব্লাসফেমি (ধর্ম রক্ষার্থে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া) আইনের অপব্যবহার প্রতিরোধ করে, মানবাধিকার বিষয়ক সময়োপযোগী সংস্কার এবং আইন প্রণয়ন করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

২০২২ সালটিই শুরু হয়েছিল পাকিস্তানের শিয়ালকোটে এক শ্রীলঙ্কার নাগরিককে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা এবং তার শরীরে আগুন দেওয়ার মর্মান্তিক খবর দিয়ে। বেসামরিক এবং সামরিক নেতারা এ ঘটনাটিকে ভয়াবহ, লজ্জাজনক এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে নিন্দা করেন।

তবে এই ঘটনার এক মাস পরেই পাকিস্তানের পাঞ্জাবে, পবিত্র কোরআনের পাতা পুড়ানোর অভিযোগে অপর একজন ব্যক্তিকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।

স্থানীয় পুলিশ নিজেদের সুরক্ষার জন্য অভিযুক্তকে মিয়া চুন্নুর থানা থেকে চলে যেতে দেয় যেখানে জনতা উপস্থিত ছিল।

যাজক উইলিয়াম সিরাজ অজ্ঞাত মোটরসাইকেল চালকদের গুলিতে নিহত হন এবং তার বন্ধু প্যাট্রিক ২০২২ সালের, ৩০ জানুয়ারি পেশোয়ারে একই ঘটনায় আহত হন, যা শহরের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে বিক্ষোভের জন্ম দেয়।

পাকিস্তানের চমকানি রিং রোড এলাকায় সংঘটিত এই ঘটনাটি জনমনে সন্ত্রাস পুনরুত্থানের আতঙ্কের সৃষ্টি করে।

মে মাসে অনুরূপ একটি ঘটনায়, একজন সেমিনারি ছাত্র, ওকারা জেলার আহমাদিয়া সম্প্রদায়ের সদস্য, আব্দুল সালাম কে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।

একই সম্প্রদায়ের অপর একজন সদস্যকে, চেনাব নগর নামে পরিচিত, পূর্বাঞ্চলীয় শহর রাবওয়াতে ধর্মীয় স্লোগান দিতে অস্বীকার করার অভিযোগে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।

খাইবার-পাখতুনখোয়ার ডেরা ইসমাইল খানে তিনজন মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষকও তাদের সহকর্মীকে ব্লাসফেমির অজুহাতে খুন করা হয়।

কাউন্সিল অফ ইসলামিক আইডিওলজি (সিআইআই) গত ফেব্রুয়ারিতে ঘোষণা করেছে যে, ব্লাসফেমির অভিযোগে একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংসতা শরীয়ত, সংবিধান এবং মানবতার পরিপন্থী।

কাউন্সিল একটি জাতীয় কমিশন গঠনের পরামর্শ দিয়েছে যা এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশ পাঠাবে।

সিআইআই অধিবেশনের সভাপতিত্ব করার পরে একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা, ডাঃ কিবলা আয়াজ ধর্ম অবমাননার পরিপ্রেক্ষিতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনার নিন্দা করেন।

তিনি বলেন যে শিয়ালকোট এবং খানেওয়ালের ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা উচিত। এতে করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা তৈরি হবে।

পূর্বে সরকার সংবেদনশীল আইনের অপব্যবহার রোধ করতে যারা ব্লাসফেমির মিথ্যা অভিযোগ করে, তাদের সকলকে শাস্তি দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিল।

গত আগস্টে, বিচারপতি কাজী ফয়েজ ঈসা এবং বিচারপতি সৈয়দ মনসুর আলি শাহের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ সালামত মানশা মসীহের গ্রেপ্তার-পরবর্তী জামিনের আবেদনের শুনানি করেন। তিনি লাহোর ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির (এলডব্লিউএমসি) ঝাড়ুদার হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে ব্লাসফেমির অভিযোগ আনা হয়।

বিচারপতি কাজী ফয়েজ ঈসা ৯ পৃষ্ঠার বিস্তারিত রায়ে বলেন, দুর্ভাগ্যবশত এই সকল মামলাগুলোই ব্যাপক প্রচার পায়, যা সমাজে বিরূপ প্রভাব ফেলে।

আদালত আরও মন্তব্য করে যে ইসলামিক আইনশাস্ত্র ধর্ম সম্পর্কিত অপরাধগুলোকে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে এবং এ ধরনের অপরাধে অভিযুক্তের দোষ প্রমাণ করার জন্য সর্বোচ্চ প্রমাণের প্রয়োজন হয়।

গত জুলাই মাসে, সাবেক রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারির নিজ জেলা কাজী আহমেদ থেকে একজন হিন্দু মেয়েকে অপহরণ করে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়।

মেয়েটির পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সম্প্রদায়ের সদস্যরা জারদারি বাড়ির বাইরে বিক্ষোভ করে তাদের মেয়েকে পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছিল।

১৬ বছর বয়সী কারিনাকে, গত ৬ জুলাই অপহরণ করা হয়। একই দিনে তাকে ধর্মান্তরিত করে মুসলিম খালিকুজ জামানের সাথে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়।

মেয়েটির আত্মীয় স্বজনদের দাবি, অপহরণকারীর বিরুদ্ধে এফআইআর নথিভুক্ত করা হলেও পুলিশ এ নিয়ে কোনও ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

গত মার্চের শুরুতেই, হিন্দু সম্প্রদায়ের এক তরুণীকে শুক্কুর জেলায় গুলি করে হত্যা করা হয়। অভিযুক্তকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে ১৮ বছর বয়সী পূজা কুমারীকে ছুহারা মান্ডি এলাকার কাছে তার নিজের বাড়িতেই গুলি করে হত্যা করা হয়।

পাকিস্তানে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত হওয়া ঠেকাতে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। যা সারাবিশ্বে বিতর্কের সৃষ্টি করে।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি সিন্ধুতে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ এবং জোরপূর্বক বিয়ে বন্ধ করার জন্য সিন্ধুর মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলি শাহকে আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেন।

সিএম মুরাদ চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টোর সাথে টেলিফোনে কথোপকথনের সময়, তাকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ এবং জোরপূর্বক বিবাহের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির জন্য একটি কমিটি গঠনের কথা জানান।

এ নিয়ে, বিলাওয়াল বলেন যে সিন্ধু ইতিমধ্যেই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আইনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তিনি আশা করছেন যে জোরপূর্বক বিবাহের বিষয়ে আইন প্রণয়নের প্রচেষ্টাও একদিন সফল হবে।

অন্যদিকে, জোরপূর্বক বিবাহ সংক্রান্ত জরুরি বৈঠকের সভাপতিত্ব করার সময়, মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলি শাহ বলেন যে, সিন্ধু সরকার জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের বিরুদ্ধে এবং সমস্ত সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শাহ বলেন, সিন্ধু সরকার জোরপূর্বক ধর্মান্তর আইনের বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করতে একটি কমিটি গঠন করবে, যা তাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো যাবে।

পাকিস্তানে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়গুলোর বিরুদ্ধে ভাঙচুরের আরেকটি ঘটনায়, গত জুন মাসে করাচির কোরাঙ্গি এলাকায় শ্রী মারি মাতার মন্দিরে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়।

শ্রী মারি মাতা মন্দির কোরাঙ্গী থানার সীমানার মধ্যে জে এলাকায় অবস্থিত। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মন্দির পরিদর্শন করে এবং ঘটনার খোঁজ নেয়।

ঘটনাটি করাচিতে বসবাসকারী হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ও ভয়ের সৃষ্টি করে। কোরাঙ্গি এলাকায় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

ঐ এলাকার হিন্দু বাসিন্দা সঞ্জীব জানান যে, মোটরসাইকেলে করে ছয় থেকে আটজন লোক এসে মন্দিরে হামলা চালায়।

কোরাঙ্গীর এসএইচও ফারুক সানজরানি নিশ্চিত করেন যে, পাঁচ থেকে ছয়জন অজ্ঞাত সন্দেহভাজন ব্যক্তি মন্দিরে প্রবেশ করে এবং ভাঙচুর করে পালিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন যে মন্দিরে হামলাকারী অজ্ঞাত সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে৷ উল্লেখ্য, পাকিস্তানের সংখ্যালঘু হিন্দু জনগোষ্ঠীর মন্দিরগুলো প্রায়ই জনতাদের সহিংসতার শিকার হয়৷

গত জুলাই মাসে, পাকিস্তানের প্রথম হিন্দু মহিলা পুলিশ মনীষা রোপেটা, সিন্ধু পুলিশে ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ হিসেবে যোগদান করেন।

রোপেটা ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে সিন্ধু পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

গত আগস্টে, পবিত্র কোরআন অবমাননার একটি কথিত ঘটনায় হায়দ্রাবাদের সদর এলাকায় অশান্তির সৃষ্টি হয়। ঐ এলাকার হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে যে ভবনে ঘটনাটি ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠে ঐ ভবনটি ঘেরাও করে ফেলে।

বিক্ষুব্ধ জনতা ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে, পুলিশ তাদের বাধা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরবর্তীতে রেঞ্জার্সের একটি দলও ঘটনাস্থলে পৌঁছে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পুলিশ ঘটনার সাথে জড়িত একজন স্যানিটারি কর্মী অশোক কুমারকে গ্রেপ্তার করে এবং পরে স্থানীয় দোকানদার বিলাল আব্বাসির অভিযোগের ভিত্তিতে পাকিস্তান দণ্ডবিধির ২৯৫-বি এবং ৩৪ ধারার অধীনে একটি এফআইআর-এ তার নাম উল্লেখ করে।

লক্ষ লক্ষ হিন্দু এবং শিখ তীর্থযাত্রীদের সারা বছর ধরে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার জন্য পাকিস্তানে যাওয়ার ভিসা দেওয়া হয়।

গত নভেম্বরে, বাবা গুরু নানকের জন্ম উদযাপনে যোগ দেওয়ার জন্য পাকিস্তান ভারত থেকে অন্তত ২৯৪২ জন শিখ তীর্থযাত্রীকে ভিসা দিয়েছে।

পূর্বে, জুন মাসে, মহারাজা রঞ্জিত সিংয়ের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে, নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশন তার বার্ষিকীতে যোগদানের জন্য ভারত থেকে শিখ তীর্থযাত্রীদের ৪৯৫ টি ভিসা ইস্যু করে।

একইভাবে, জেলার একটি ছোট শহর হায়াত পিটাফির ঐতিহাসিক শাদানি দরবারে শিব অবতারী সতগুরু সন্ত শাদারাম সাহেবের ৩১৪ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের হিন্দু তীর্থযাত্রীদের জন্য হাই কমিশন ১০০ টি ভিসা জারি করে।

আবার, ডিসেম্বরের শুরুর দিকে, গুজরানওয়ালায় একটি আহমাদি উপাসনালয়ের মিনার ভেঙ্গে ফেলার অভিযোগ উঠে।

গুজরানওয়ালা প্রশাসন বিষয়টি সমাধানের জন্য আহমদী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সাথে একটি বৈঠক করে, যেখানে বলা হয়, মিনার ভেঙ্গে ফেলা ছাড়া তাদের কাছে আর কোনও উপায় ছিল না।

গত ২৫ ডিসেম্বরে, ভাক্কর এলাকায় কায়েদ-ই-আজম দিবস এবং বড়দিন উৎসব উপলক্ষে নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়েও অসাধারণ ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

সংখ্যালঘু বিষয়ক দপ্তরের অধীনে সম্পন্ন হওয়া কোরাঙ্গি শিল্প এলাকায় গসপেল পেন্টেকোস্টাল চার্চের উদ্বোধন করে পাকিস্তানের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী গিয়ান চাঁদ এসারানি গত বছরের ইতি টানেন।

পিপিপি এমপিএ অ্যান্টনি নাভিদ এই প্রকল্পের সুপারিশ করেছিলেন। নির্বাহী প্রকৌশলী চার্চের মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়ে মন্ত্রীকে বিস্তারিত অবহিত করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, পিপিপি ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের ভেদাভেদ ছাড়াই জনগণের সেবায় বিশ্বাসী।

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ