spot_img
20 C
Dhaka

২৯শে জানুয়ারি, ২০২৩ইং, ১৫ই মাঘ, ১৪২৯বাংলা

পাকিস্তানের বন্যা প্রভাবিত শিশুদের সাথে কথোপকথন

- Advertisement -
নিলুফার আফ্রিদি কাজী:

২০২৩ সালে এসেও পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের অবস্থা সংকটাপন্ন। আমি ২০২২ সালের জুলাই মাস থেকেই সেখানে তহবিল সংগ্রহ ও ত্রাণকাজের সাথে জড়িত ছিলাম।

যদিও আমি একসময় আশা করেছিলাম যে পাকিস্তান সরকার বন্যার্তদের জন্য কোনও না কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, কিন্তু সাত মাস হয়ে যাওয়ার পরেও সরকারের পক্ষ থেকে তাদের জন্য কোনও ধরনের পদক্ষেপই গ্রহণ করা হয়নি।

দেশে সম্পদের অভাব রয়েছে ব্যাপারটি এমনও নয়, বরং আমার মতে সরকার নিজেই এ বন্যার্তদের সাহায্য করতে ইচ্ছুক নয়।

জাফরাবাদ জেলার অসংখ্য ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোর মধ্যে একটি হলো ওয়াজির আবাদ আব্রো অঞ্চল। এখানকার দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া, ১০ বছরের মেয়ে সুমাইলার সাথে আমরা বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলি।

সুমাইলা তার বাবা, মা, ভাইবোনদের সাথে মাটির তৈরি ছোট একটি ঘরে থাকত। তার কাছ থেকে আমরা জানতে পারি, পুরো গ্রামে ৩০ বছরের বেশি বয়সী সবাই অক্ষরজ্ঞানহীন।

জাফরাবাদ শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ওয়াজির আবাদ আব্রো। এখানকার মোটামুটি সব জমিই সরকারের অধীন এবং এখানকার বেশিরভাগ মানুষই তাদের জীবিকার জন্য কৃষি ও গবাদি পশুর উপর নির্ভরশীল।

সরকারই এখানকার সমস্ত জমির তত্ত্বাবধায়ক, যদিও বাসিন্দারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে এখানে রয়েছে। তারা হয় তাদের নিজস্ব কিছু পশুসহ সরকারি মালিকানাধীন পশুসম্পদ পরিচালনা করে জীবিকা অর্জন করে, অথবা সরকারের জন্য গম এবং ধান চাষ করে। এখানে সরকার কিংবা তাদের মধ্যে কতটুকু অংশ ভাগ হবে এ ব্যাপারে স্পষ্ট কোনও তথ্য নেই, নেই কোনও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক প্রজাস্বত্ব চুক্তি। বরং বহু বছর ধরে কৃষকেরা এখানে ধান, গম বপন থেকে শুরু করে ফসল ফলানো পর্যন্ত সমস্ত খরচ একাই বহন করছেন এবং যখন ফসল কাটার সময় আসছে তখন সরকার সেখান থেকে অর্ধেক কিংবা তারও বেশি ফসল নিয়ে যাচ্ছে।

পশুসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও এই একই চিত্রই দেখতে পাওয়া যায়। সরকার এই এলাকার অশিক্ষিত, অদক্ষ, দুর্বল লোকদের নিজের ইচ্ছামত ব্যবহার করে যাচ্ছে।

সরকারের এই আচরণের অনেক উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে পাকিস্তানের আনাচে কানাচে। বন্যা পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলের লোকেরা নিজেদের নূন্যতম মৌলিক অধিকারটুকুও ভোগ করতে পারেনি।

সুমাইলার কাছ থেকে বন্যাকালীন তার দুর্বিষহ পরিস্থিতির বর্ণনা শুনা যায়। বন্যা তার মাটির ঘরটিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে। তার গ্রামের অধিকাংশ মানুষই ঘরবাড়ি হারিয়ে নিজেদের নিরাপদ রাখতে শহরের কাছাকাছি উঁচু জায়গায় চলে গিয়েছেন।

দুই মাস হলো সুমাইলা তার পরিবারের সাথে গ্রামে ফিরে এসেছে। যদিও এ গ্রামে তারা ৮০ বছর ধরে বসবাস করে আসছে, তবে গ্রামটি সরকারের অধীন থাকার কারণে সরকার যখন ইচ্ছা তাদের বাস্তুচ্যুত করার ক্ষমতা রাখে।

এই খারাপ পরিস্থিতির মধ্যেও সুমাইলা তার স্বপ্নকে ভুলে যায়নি। সে স্কুলে ফিরে যেতে চায়, আবার শুরু করতে চায় পড়াশুনা। সে বড় হয়ে শিক্ষক হতে চায়। যদিও বন্যার কারণে সে তার বইখাতা, রংপেন্সিল সবকিছুই হারিয়েছে।

সবকিছু ঠিকঠাক করে সুমাইলার বাবা আবার তার মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে পারবেন কি না এ ব্যাপারে তিনি সন্দিহান। তিনি এ বিষয়ে এনজিও বা দাতব্য সংস্থার সাহায্য কামনা করছেন।

সরকারি জমিতে বসবাসরত এ মানুষগুলোর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান এবং মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করতে পারেনি রাষ্ট্র। এটি কি আইনগতভাবে সংবিধানের লঙ্ঘন নয়, আমি সেটাই ভাবি।

আমি নিজেই অবাক হচ্ছি এই ভেবে যে, সরকারি মালিকানাধীন জমি আবার কি? সরকার কি উদ্দেশ্যে এ জমির মালিকানা ধরে রেখেছে? কেন এ জমিগুলো নাগরিকদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়নি? ভাল স্কুল, স্বাস্থ্য সুবিধা কেন এ এলাকায় নেই? কেন সরকার এ এলাকায় বিনিয়োগ করেনি?

সরকার এখানে দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং স্থিতিস্থাপক ব্যবস্থা তৈরি করবে কিনা তাও আমি ভাবছি। স্বল্প আয়ের আবাসন প্রকল্পগুলোর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কোথায়?

এলাকাটি সমগ্র প্রদেশের রুটির ঝুড়ি৷ এখানে পানির প্রাচুর্য রয়েছে, জমিগুলো উর্বর, অথচ এই এলাকার মানুষগুলো অপুষ্টিতে ভুগছে, তারা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।

সুমাইলার কাছে বন্যাকালীন অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে সে ঐসকল দিনের কথা ভাবতে ভাবতে ভয় পেয়ে যায়। তার চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠছিল। গত বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর, এই কয়েকটি মাস তাদের জন্য ভয়াবহ ছিল। ৩০ দিনেরও বেশি সময় ধরে অবিরাম বর্ষণে গ্রামের প্রায় সব বাড়িঘরই ডুবে যায় বন্যায়।

সুমাইলার পরিবারসহ আরো অনেক পরিবার ২০ দিন ধরে রাস্তার ধারে পড়ে ছিল। এ ২০ দিন তারা ত্রাণের দ্বারা প্রাপ্ত খাবার খেয়েই জীবনধারণ করছিল। অনেকসময় তারা ত্রাণের খাবারও পান নি। তখন তারা দুইবেলা চা বা নান খেয়েই থেকেছেন।

সুমাইলাকে মাংসের কথা জিজ্ঞেস করা হলে সে বলে কখনো কখনো ঈদের সময় সে মাংস খেতে পারে। আর নয়তো বছরে আর কখনোই তার পরিবারের মাংস ক্রয় করার সামর্থ নেই। আমি তখন এই অঞ্চলের মানুষদের অপুষ্টিতে ভুগার কারণ খুঁজে পেলাম।

সুমাইলাকে তার তিনটি ইচ্ছার কথা জিজ্ঞেস করা হলে সে বলে, তার প্রথম ইচ্ছা হলো সে নতুন বই এবং স্কুল ব্যাগ চায়। দ্বিতীয় ইচ্ছা, সে এমন একটি বাড়ি চায় যা বন্যার সময় কখনোই আর ভেঙ্গে পড়বে না এবং তার তৃতীয় ইচ্ছা হলো সে তার পড়াশুনা শেষ করে শিক্ষক হতে চায়।

বেলুচিস্তানে কাজ করতে এসে আমরা কে জমির মালিক কিংবা কে চাকর তা দেখিনি। বরং যাদের ত্রাণ প্রয়োজন সকলকেই ত্রাণ প্রদানের চেষ্টা করেছি।

জাফরাবাদ থেকে আনুমানিক ৫০ কিলোমিটার দূরে জাফরাবাদ জেলার জুধাইর ইউনিয়ন পরিষদে আলী ফকির গ্রাম অবস্থিত। এখানকার জনগণ সবাই একক বাড়িওয়ালার ভাড়াটে। অর্থাৎ তারা সেখানে বসবাস করতে পারবে যদি তারা বাড়িওয়ালার বা বড় জমিদারের গবাদি পশুর দেখভাল করে এবং তার জমিতে ফসল ফলায়। এতে দোষের কিছুই নেই। কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়ায় তারা কি নিজেদের কিংবা নিজেদের সন্তানদের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে উপার্জন করতে সক্ষম?

এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই না। তাহলে এই মানুষগুলোর চাহিদা পূরণের দায়ভার কার?

এইসব বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটেদের মধ্যেও আইনত কোনও চুক্তি নেই। ফসল চাষের খরচ এবং সমস্ত ঝুঁকি একা কৃষকরাই বহন করেন। অথচ ফসলের ৫০% ভোগ করেন জমিদারেরা।

বংশ পরম্পরায় এই নাগরিকেরা এই অঞ্চলে বসবাস করলেও বাড়ির মালিক যখন ইচ্ছা তাদের উচ্ছেদ করতে পারেন। এক্ষেত্রে কোনও আইনি ব্যবস্থাই তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে না।

আমরা এখানকার ১২ বছর বয়সী নাগরিক জহুরের সাথে কথা বলি। সে বংশগত কোনও রোগের কারণে শারীরিকভাবে অক্ষম। তার কোনও হাতই নেই এবং সে অপুষ্টির শিকারও।

ছোট জহুর পড়াশুনা শিখেনি কিন্তু গ্রামের অন্যান্যদের স্কুলে যেতে দেখলে তারও ইচ্ছা হয় স্কুলে যাওয়ার, লেখাপড়া শেখার। তার বাবাও শারীরিকভাবে অসুস্থ, তার মা জিনাত একাহাতে পুরো সংসার সামলাচ্ছেন।

এই পরিবারের তিন প্রজন্মই নিরক্ষর, কেউ পড়তে কিংবা লিখতে পারে না। জহুরের দাদার কাছ থেকে পাওয়া কিছু টাকায় তাদের দুইবেলা খাবার জোটে মাত্র।

জহুরের কাছ থেকে তার বন্যাকালীন অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে সে বলে, সে প্রচুর ভয় পেয়েছিল এই ভেবে যে তার পরিবারের প্রায় সবাই প্রতিবন্ধী। যখন পুরো গ্রামের মানুষ অন্যত্র চলে যাচ্ছিল তখন তারা কোথায় যাবে, কিভাবে যাবে এ বিষয় নিয়েই চিন্তা করছিল। তবে তার মা এবং দাদার সহযোগিতায় অবশেষে তারা অন্যত্র সরে আসে।

এখানে কোনো উদ্ধার সেবা নেই। এখানে কোনো সিভিল ডিফেন্স নেই। অ্যাম্বুলেন্স নেই।

আমার মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি খরচ করব? পাকিস্তানে আমাদের কী বিনিয়োগ করা উচিত?

দুই মাস ধরে অস্থায়ী শিবিরে থাকায় ক্রমাগত নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি জহুরকে অসহায় করে তোলে। অন্তত, গ্রামে সবকিছু এবং সবাই তার পরিচিত ছিল।

অস্থায়ী শিবিরে থাকাকালীন জহুরও তার পরিবারের বাকি সদস্যদের সাথে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। তার শুধু মনে আছে অশেষ বেদনা আর কান্না; তার দাদা তাকে একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন যিনি কিছু ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন, যা তার একটু সাহায্য করেছিল।

জহুরকে তার তিনটে ইচ্ছের কথা জিজ্ঞেস করা হলে সে বলে, তার প্রথম ইচ্ছা হলো, তার পা ভালো হয়ে যাক। দ্বিতীয় ইচ্ছা সে তার বন্ধুদের সাথে খেলতে চায় এবং স্কুলে যেতে চায়। তার তৃতীয় ইচ্ছা হলো সে তার নিজের একটি বাড়ি চায় যেখানে সে নিরাপদবোধ করবে।

*লেখাটি ফ্রাইডে টাইমস হতে অনূদিত

 

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ