spot_img
27 C
Dhaka

২৯শে নভেম্বর, ২০২২ইং, ১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯বাংলা

তালেবানদের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং আফগানিস্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

- Advertisement -

ডেস্ক রিপোর্ট, সুখবর বাংলা: ৫ অক্টোবর, ২০২২-এ কাবুলের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কম্পাউন্ডের মধ্যে অবস্থিত আল-ফাতাহ মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়। মূলত এ হামলার লক্ষ্য ছিলেন আফগানিস্তানের মন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ১৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে নির্মাণ করেছিলেন এই আল-ফাতাহ মসজিদ এবং ১৪ আগস্ট, ২০২২ এ তিনি এ মসজিদের উদ্বোধনও করেন।

কিছু রিপোর্ট থেকে জানা যায়,  সিরাজুদ্দিন হাক্কানি সেদিন ঐ মসজিদে নামাজ পড়তে এসেছিলেন কিন্তু বিস্ফোরণের ঠিক দশ মিনিট আগে তিনি চলে যান। মসজিদটিতে তখন ৮০০ জনের মতো মুসল্লি ছিল বলে জানা যায়। তবে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে চারজন নিহত হয়েছে।

৫ অক্টোবর,২০২২ এর বিবিসি নিউজ অনুযায়ী, হামলাকারীর একটি পা কৃত্রিম ছিল। এ হামলার ফলে তালেবানদের মধ্যকার সম্পর্কে ফাটল ধরেছে এবং ইসলামিক স্টেট অফ খোরাসান প্রদেশের (আইএসকেপি) সাথে তালেবানদের বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আব্দুল নাফিটাকোর হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মসজিদটি দর্শনার্থীরা এবং কখনও কখনও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীরা ব্যবহার করত। ইতালীয় এনজিও সহায়তা গ্রুপ ইমার্জেন্সি, কাবুলে একটি হাসপাতাল পরিচালনা করে। তারা টুইটারে জানায় যে তারা বিস্ফোরণের জায়গা থেকে ২০ জনকে উদ্ধার করে, যাদের মধ্যে দুজন হাসপাতালে পৌঁছানোর সময়ই মারা যায়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কম্পাউন্ডটি কাবুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে একটি নিরাপদ এলাকায় অবস্থিত। ক্ষমতাসীন তালেবানরা বলছে যে তারা ২০২১ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশকে সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিয়েছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও সাম্প্রতিক মাসগুলিতে শহুরে কেন্দ্রগুলিতে ধারাবাহিক বিস্ফোরণ এর বিভিন্ন খবর পাওয়া যাচ্ছে।

আফগানিস্তানে জাতিসংঘের মিশন অনুসারে, পশ্চিম কাবুলের একটি শিক্ষা কেন্দ্রে বিস্ফোরণের ফলে ৫৩ জন নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই তরুণী। যদিও কেউ আত্মঘাতী হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে প্রাথমিক রিপোর্ট থেকে ধারণা করা হচ্ছে যে এ ঘটনায় আইএসকেপি দায়ী থাকতে পারে। আইএসকেপি তালেবানদের বিরুদ্ধে সম্মুখে থেকেই যুদ্ধ করছে এবং গত কয়েক মাসে তালেবান নেতাদের উপর তারা বেশ কয়েকটি আত্মঘাতী হামলাও চালিয়েছে। আইএসকেপি-তালেবান দ্বন্দ্ব, ধর্মীয় এবং আদর্শগত। কারণ পূর্ববর্তীরা ট্রান্সন্যাশনাল সালাফি বা ওয়াহাবি ইসলামের সৌদি মডেল অনুসরণ করে, কিন্তু তালেবানরা সুন্নি ইসলামপন্থী।

যদিও এই আন্তঃআফগানিস্তান সংঘাত বর্তমানে স্বাভাবিক, তবে ৫ অক্টোবরের হামলার মূল লক্ষ্য সিরাজুদ্দিন হাক্কানিই ছিল। হাক্কানির পাকিস্তানপন্থী এবং শিক্ষা বিরোধী অবস্থানই এর মূল কারণ। মূলত তালেবানের মধ্যে সম্পর্কের ফাটল দেখা দিয়েছে।

তালেবান সংগঠন প্রধানত পশতুনদের দ্বারা গঠিত। এটা জাতিগত, আঞ্চলিক এবং উপজাতির ভিত্তিতে বিভক্ত। নীতি নিয়েও জঙ্গিদের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়। প্রসঙ্গত, তালেবানরা মেয়েদের এবং নারী শিক্ষার ব্যাপারে বিভক্ত।

তাদের একটি দল বিশ্বাস করে মেয়েদের ধর্মের দোহাই দিয়ে সীমাবদ্ধ করে রাখলে মূলত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে। অপরদিকে অন্য দলটি বিশ্বাস করে যে সমঝোতার মাধ্যমে কখনোই অন্য দেশের সাথে তাদের সম্পর্ক ভালো হবে না এবং সেজন্যেই তাদের উচিত ইসলামি পরিচয়কে আরো শক্তিশালী করার দিকে মনোনিবেশ করা এবং তাদের নিয়ন্ত্রণকে সুসংহত করা।

আগস্টের শুরুতে, তালেবানদের সমর্থনকারী এবং নারী শিক্ষার পক্ষে থাকা একজন বিশিষ্ট আফগান ধর্মগুরুকে হত্যা করা হয়। কাবুলে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে শেখ রহিমুল্লাহ হাক্কানি নিহত হয়েছেন বলেও জানা যায়। তালেবান রয়টার্সকে জানিয়েছে যে ধর্মীয় নেতাকে লক্ষ্য করেই মূলত হামলা হয়েছিল। হামলাকারী কৃত্রিম প্লাস্টিকের পায়ের মাঝে বিস্ফোরক লুকিয়ে রেখে বিস্ফোরণ ঘটায়। ইসলামিক স্টেট (আইএস) গোষ্ঠী, ধর্মগুরুকে লক্ষ্য করে, বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে। তবে তারা বলে যে হামলাটি হয়েছিল মূলত ধর্মগুরুর নিজের বাসায় যেখানে স্থানীয় রিপোর্টে বলা হয় হামলাটি চালানো হয়েছিল আফগানিস্তানের রাজধানীতে হওয়া একটি ইসলামিক সেমিনারে।

শেখ হাক্কানি ছিলেন তালেবান সরকারের সমর্থক এবং জিহাদি জঙ্গি গোষ্ঠী আইকেএসপি-এর একজন বিশিষ্ট সমালোচক। আইকেএসপি আফগানিস্তানে কাজ করে এবং তালেবানের শাসনের বিরোধিতা করে। তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে দেশে নিহত হওয়া প্রধান প্রধান ব্যক্তিদের মধ্যে হাক্কানি একজন। শেখ হাক্কানি এর আগে দুটি হত্যা প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন, তার মধ্যে শেষবার ২০২০ সালে আইএসকেপি পেশোয়ারের একটি ধর্মীয় বিদ্যালয়ে বিস্ফোরণ ঘটায় তাকেই মারার জন্য। যদিও তিনি এ হামলায় বেঁচে যান তবে হামলায় কমপক্ষে ৭ জন নিহত হয়। আইএসকেপি এ হামলার দায় স্বীকার করে।

রহিমুল্লাহ হাক্কানি আফগানিস্তানের হাক্কানি জঙ্গি গোষ্ঠী সাথে সম্পর্কিত ছিলেন না। এই ধর্মীয় নেতা এর আগে নারী শিক্ষার সমর্থনে একটি ফতোয়া বা ধর্মীয় আদেশ জারি করেছিলেন। এ ফতোয়াটি আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে একটি বিতর্কিত বিষয় হয়ে উঠে। এই বছরের শুরুর দিকে বিবিসি-র সাথে একটি সাক্ষাৎকারে, শেখ হাক্কানি যুক্তি দিয়েছিলেন, আফগান নারী ও মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। শরিয়াত (আইন) মতে নারী শিক্ষা অনুমোদিত নয় বলে আদৌ কোনো যুক্তি নেই। তিনি আরো বলেন, “সব ধর্মীয় বইয়ে নারী শিক্ষাকে বৈধ ও বাধ্যতামূলকই বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি তার যুক্তি প্রমাণ করতে বলেন, আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মতো ইসলামিক পরিবেশে যদি একজন মহিলা অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তার চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তাহলে তার চিকিৎসার জন্য একজন মহিলা ডাক্তারেরই প্রয়োজন হবে।

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের একটি মসজিদে ১৮ আগস্ট, ২০২২ এ সন্ধ্যার নামাজের সময় একটি বোমা বিস্ফোরণে একজন বিশিষ্ট আলেমসহ অন্তত দশজন নিহত হন। নিহত আলেম ছিলেন মোল্লা আমির মোহাম্মদ কাবুলি, যিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট হানাফি আলেম। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, শহরের খের খান্না পাড়ার সিদ্দিকিয়া মসজিদকে লক্ষ্য করেই আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩০ জনেরও বেশি। এছাড়াও জুলাই মাসে, তালেবানদের প্রতি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া একজন শীর্ষ সালাফিস্ট ধর্মগুরুকে কাবুলে তারই বাড়িতে রহস্যজনকভাবে হত্যা করা হয়। সর্দার ওয়ালী সাকিবকে তালেবানপন্থী আলেমদের এক সমাবেশে যোগ দেওয়ার কয়েকদিন পরেই ছুরিকাঘাত করা হয়। তালেবানরা এই সমস্ত হত্যাকাণ্ডের জন্য আইএসকেপিকে দায়ী করেছে। তবে অন্যরা তালেবানেরই অন্তর্ভুক্ত সালাফি বিরোধী ব্যক্তিত্বদের এ সমস্ত ঘটনার জন্য দায়ী করছে। নভেম্বরে, পরিচিত এক আইএসকেপি মতাদর্শী, আবু মুস্তফা দারভেশজাদেহ নিহত হন। ইসলামি শরিয়া আইন বাস্তবায়নে তালেবানদেরর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তিনি একটি সমালোচনামূলক বই লিখেছিলেন।

তালেবানদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং তালেবান এবং আইএসকেপির মধ্যে দ্বন্দ্ব এই দুই কারণেই আফগানিস্তানে নতুন করে গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক ও মানবিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকার ফলে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদেরকেই এ গৃহযুদ্ধ আটকাতে কাজ করতে হবে।

এদিকে সীমান্তের ওপারে থাকা, পাকিস্তান আফগানিস্তানের অস্থিতিশীল অবস্থার অপেক্ষাই করছে যাতে করে তারা দেশটির উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। মূলত হাক্কানি দল পাকিস্তানেরই সৃষ্ট এক সংগঠন। হাক্কানিরা অতীতেও শীর্ষ তালেবান নেতাদের মাঝে মতভেদের সৃষ্টি করেছে এবং তারা আবারো সে কাজ করারই চেষ্টা করছে। তবে এবার যদি তারা তাদের কাজে সফল হয় তবে আফগানিস্তান আগের তুলনায় আরো বেশি সহিংসতার মুখোমুখিই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ