spot_img
29 C
Dhaka

২৭শে নভেম্বর, ২০২২ইং, ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯বাংলা

তনয়ের শৈশব ও একটি শারদীয় উৎসব- রাজিব রাজিবুল হাসান

- Advertisement -

নিজস্ব প্রতিবেদক, সুখবর বাংলা: ছোট বেলা থেকেই তনয় অসম্ভব কৌতুহুলী বিশেষ করে হিন্দু মিথলজি সম্পর্কে জানবার প্রবল ইচ্ছা ততো দিনে তনয় অষ্টম পেরিয়ে নবম শ্রেণীতে উন্নিত হয়েছে ওদের বাড়ি থেকে বহুক্রোস পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে হয় তখন আশ্বিনের শেষ প্রায়, শরতের শুভাগামন

একদিন ওর কিছু সহপাঠিরা সবাই মিলে ভাবছে কাশ বনে কাশ ফুল তুলতে যাবে স্কুলের অদূরেই খরকা বিল নয়নাভিরাম দৃশ্যপটে আঁকা চারপাশ শরৎ কালে বিলের পানি অনেকটাই কমে যায় যে কারনে কিছু কিছু জায়গায় কাঁদা বেলে মাটির মিশ্রনে জেগে উঠে ছোট ছোট টিলা ধবধবে সাদা কাশফুলে ছেয়ে আছে টিলা গুলি দূর থেকে যেন মনে হয় খন্ড খন্ড মেঘ নেমে এসেছে ।

পাশেই পাল ঘোষ বাড়ি বাড়ি গুলোর মধ্যে দিয়ে যেতে হয় খরকা পারে একদিন ওরা জন মিলে খরকা বিলের উদ্দেশ্য রৌনা হলো হাঁটতে হাঁটতে ওরা পাল বাড়ির উপর দিয়ে যাচ্ছিলো আর তাঁদের তৈরি মাটির হাড়িপাতিল বানানো দেখছিলো

কিছু দূর যেতেই হঠাৎ তনয়ের চোখ পড়ে দশ হাত বিশিষ্ট একটি প্রতিমার দিকে তখনও তনয়ের খুব একটা ভালো ধারনা নেই যে ওটা কি বা কেন বানাচ্ছে খুব কৌতূহল নিয়ে তনয় কাছে যায় এবং ধরতে যায় মুসলিম বলে ওকে ওখান থেকে তাড়িয়ে দেয়

ওর কৌতূহল আরও বেড়ে যায় আজ আর ওর কাশ বন দেখা হলো না মন খারাপ করে স্কুলে ফিরে গেল টিফিনের পর ওদের ইসলাম ধর্ম ক্লাস শুরু হবে ঠিক তার আগমুহুর্তে বলা হলো হিন্দু ধর্মালম্বী যারা আছো সবাই পাশের রুমে যাও তোমাদের হিন্দু ধর্ম শিক্ষা ক্লাস হবে বলা বাহুল্য তখন অল্প কিছু দিনের জন্য সহায়ক বই হিসাবে হিন্দু ধর্ম শিক্ষা বইয়ের প্রচলন ছিলো

তনয় ওর জন হিন্দু সহপাঠিদের সাথে ভয়ে ভয়ে হিন্দু ধর্ম শিক্ষা ক্লাসে ঢুকে যায় সেই দিনের পাঠ্য সূচি ছিলোমা দূর্গার পরিচয় শুভাগমনহরিপদ স্যারের ক্লাসতনয় শুনেছে তিনি খুব মজা করে হিন্দু ধর্ম শিক্ষা পাড়ান এবার নড়ে চড়ে বসলো তনয়

স্যার পড়াতে আরাম্ভ করলেন– “মহিষাসুরের অত্যাচারে স্বর্গচ্যুত দেবতারা ব্রহ্মার শরণ নিলে ব্রহ্মা, শিব অন্য সকলকে নিয়ে বিষ্ণুর কাছে আসেন৷ তাঁদের দুর্দশার কথা জানিয়ে তাঁরা ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করেন, এর থেকে মুক্তির পথ কী? স্বয়ং ব্রহ্মার দেওয়া বরেই মহিষাসুরকে বধ করতে পারবেনা কোনও পুরুষ

বিষ্ণু এর উত্তরে বলেন, এই পরাক্রমশালী অসুরকে বধ করতে হলে নিজেদের স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়ে নিজ নিজ তেজের কাছে প্রার্থনা করতে হবে যে তাঁদের মিলিত তেজ থেকে যেন এক নারীমূর্তির আবির্ভাব হয়৷ বিষ্ণুর কথা মতো কাজ শুরু করেন দেবতারা৷

দেবতাদের দেহ থেকে তেজ নির্গত হয়ে সৃষ্টি হয় এক অপরূপা দেবীর৷ যে যে দেবতাদের দেহ থেকে তেজ নির্গত হয়েছিল, তার মধ্যে ছিলেন স্বয়ং ব্রহ্মা, শিব, বিষ্ণু ইন্দ্র৷ দেবতারা তাঁদের নিজেদের অস্ত্র এই দেবীকে দান করেন৷যত শুনছে তনয়ের আগ্রহ ততই বেড়ে যাচ্ছে

এবার তনয় স্যারের কাছে জানতে চাইলোস্যার মা দূ্র্গার কখন কি ভাবে আবির্ভাব হয়? স্যার ঘুরে ওর দিকে তাকালেন, এই ছেলে তোমার নামকি? আগেতো কখনো তোমাকে এই ক্লাসে দেখিনি? তনয় ভয়ে ভয়ে বলল স্যার আমার নাম তনয়, তনয় আবিদ স্যার বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞাসা করলেন তুমি মুসলিম? জ্বী স্যার তো তোমাদের ক্লাস রেখে এখানে কেন? স্যার আমার হিন্দু মিথলজি জানার খুব ইচ্ছা তাই আচ্ছা

কি যেন প্রশ্ন করেছিলে? হ্যা দূর্গা মায়ের আবির্ভাব? আচ্ছা শোন তবে– “দুর্গাপূজা মূলত শুক্লপক্ষে হয়ে থাকে আশ্বিন মাসের শুক্লায় যে পূজা করা হয়, তাকে শারদীয় দুর্গাপূজা আর চৈত্রমাসে যে দুর্গাপূজা হয়, তাকে বাসন্তী দুর্গাপূজা বলা হয় সনাতনীদের মাঝে দুধরনের পূজা দেখা গেলেও সাধারণত বাসন্তী পূজাটি খুব কম সংখ্যক মানুষের মাঝেই সীমাবদ্ধ

মূলত বাসন্তকালে দেবী দুর্গার পূজা দেয়ার রীতি থাকলেও ভগবান শ্রীরাম যখন সীতাকে উদ্ধার করার জন্যে লঙ্কাপানে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি রাবণকে দমন সীতাকে উদ্ধারের জন্যে শক্তির দেবী দুর্গার পূজা করেন আশ্বিন মাসে শ্রীরামচন্দ্র পূজা দিয়েছিলেন বিধায় তার ধারাবাহিকতায় শরৎকালে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয় অকালে পূজা দেয়া হয়েছিল বিধায় একে আলোকবোধনও বলা হয়ে থাকে

দুর্গাপূজার মূল উৎসবকাল পাঁচদিনমহা ষষ্ঠী, মহা সপ্তমী, মহা অষ্টমী, মহা নবমী বিজয়া দশমী বিজয়ার দিনে দেবী দুর্গা মর্ত্যলোক ত্যাগ করে ফেরত চলেন তবে দেবী দুর্গা কবে আসেন মর্ত্যে? এর উত্তরই শুভ মহালয়া মহালয়া শব্দের আক্ষরিক সমার্থ হলোআনন্দ নিকেতন

দেবী মায়ের আগমনী সুরে আনন্দের বার্তা আসে পৃথিবী জুড়ে দেবীপক্ষের সূচনাকালেই ধরাধামে আবির্ভূত হন দুর্গা চাঁদের হিসেব অনুসারে দেবীপক্ষের সূচনা হয় পূর্বের অমাবস্যার দিনে এই দিনটিই মহালয়া নামে পরিচিত যেহেতু চাঁদের হিসেবে প্রতি অর্ধমাসে একবার করে পূর্ণিমা অমাবস্যা হয়, তাই দেবীপক্ষের সমাপ্তি যে পঞ্চদশ দিনে অর্থাৎ পূর্ণিমায়, এই দিনটি কোজাগরী পূর্ণিমা নামে পরিচিত

সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দিনটিতে লক্ষ্মীপূজার আয়োজন করে থাকেন দুর্গাপূজা মূলত পাঁচদিন ব্যাপ্তির পূজো হলেও মহালয়া থেকেই প্রকৃত উৎসবের সূচনা হয় ক্লাস শেষে ওরা আবার কমবাইন্ড ক্লাসে একত্রিত হলো এই সুবাদে তনয় জন হিন্দু বন্ধু পেয়ে গেল উত্তম, পরিতোষ, দ্বীজেন এবং তৃণয়ী

ওদের মধ্যে তৃণয়ীকে একটু অন্যরকম মনে হয়েছে তনয় মুসলিম এটা শুনার পর থেকে তৃণয়ী যেন একটু কেমন কেমন আচরন করছে! যদিও ক্লাসে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী মুসলিম ওরা সবসময় ওদের মতো করে থাকতো, তনয় কিছু দিলে খেতে চাইতো না এমনকি মুসলিমদের দোকান থেকে কিছু কিনতো না সবসময় ধীরেন বাবুর দোকান থেকে টিফিন কিনে খেতো

তনয়ের এসব একদমই ভালো লাগতো না, ওতো হরহামেশেই ধীরেনর দোকান থেকে টিফিন কিনে খেত যাইহোক পরবর্তী ক্লাসে দফতরী দুদু ভাই খাতা হাতে ক্লাসে প্রবেশ করলেন দুদু ভাইয়ের খাতা হাতে প্রবেশ মানেই খুশির খবর মানে বন্ধের নোটিশ এবারও তাই হলো দূর্গা পূজা উপলক্ষে আগামী এক সপ্তাহ স্কুল বন্ধ ওদের কাছে গল্প শুনেছে পূজায় নাকি অনেক মজা হয় তনয়ের খুব ইচ্ছা এবারের পূজায় সব গুলো মন্ডপ‘ ঘুরে দেখবে তনয় ওদের কে বলল এবার পূজোয় তোদের সাবার বাড়ি ঘুরে আসবো

হরিপদ স্যারের ক্লাসের পর ওদের ধর্মের প্রতি একটু কেমন যেন দুর্বলতা কাজ করছে ওর অন্য হিন্দু বন্ধুরা সবাই রাজি হলেও তৃণয়ী কোন ভাবেই রাজি হচ্ছে না বরং রেগে গিয়ে ওদেরকে বলছে জাত কূলের মাথা খেয়েছিস তোরা একটা মুসলিম ছেলেকে বাড়ি নিবি? হে রাম!!

তৃণয়ীর চেচামেচি শুনতে শুনতে তনয় তৃণয়ীর হাত নিয়ে ইচ্ছে মতো ওর হাতের সাথে ঘষে দিয়ে বলল এবার তোর হাত কেটে ফেল দেখি কেমন পারিস? তৃণয়ী আরও রেগে গেল এটা কি করলি তুই? তুই আমার সাথে জীবনেও কথা বলবিনা তাই না? বিশ্বাস কর তৃণয়ী তুই যখন রাগ করে কিছু বলিস তখন আমার কি যে ভালো লাগে বোঝাতে পারবোনা

তবে একটা কথা মনে রাখিস ধর্মের দোহায় দিয়ে কাউকে ছোট করা কিংবা কষ্ট দেওয়া ঈশ্বর পছন্দ করেন না দেখ তৃণয়ী তোর পূজার আনন্দ আমি নষ্ট করতে চাইনা পূজার সময় তোদের বাড়ির ত্রিসীমায় আমি যাবোনা সে সময় পূজায় মেলা বসতো মেলায় অনেক কিছু পাওয়া যেত, বিভিন্ন রকমের খেলনা, মাটির হাড়িপাতিল, পুতুল, চিড়ার নাড়ু, তিলের নাড়ু, নারকেলের নাড়ু, চিনির সাজ আরো কতো কিছু

তনয়দের এলাকায় ঠাকুর বাড়ি মোড়ের প্রতিমা দেখতে বেশী সুন্দর হতো দ্বীজেনপরিতোষউত্তমদের বাড়ির পূজোয় যেতে হলে ঠাকুর বাড়ির পূজা পেরিয়ে যেতে হয়, তনয় ভাবলো তাহলে এটা ঘুরে দেখে পরে ওদিকে যাবে মা ঢুকতেই দেখে প্রতিমার সামনে তৃণয়ী ওর সাথীদের সাথে খেলছে

ওকে দেখেই সে দিনের কথা মনে পড়লো যে কারণে তনয় আর সামনে গেলো না দূর থেকেই সবার আনন্দ উৎসব উপভোগ করছে কিছু সময় পর চললো অন্য প্রতিমা দেখার উদ্দেশ্য ঢাকের তালে মুখর সারা এলাকা তনয়ও খুব অনন্দ নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখছে, অনেক কিছু কিনছে বিশেষ করে হিন্দু মিথলজির বেশ কিছু বই কিনেছে ঘুরতে ঘুরতে দ্বীজেনদের বাড়িতে পৌছে গেলো তনয় সেখানে সবাইকে এক সাথে পেয়ে আনন্দে মেতে উঠলো তনয়ও

সে কি খাওয়া দাওয়ার ধুম দ্বীজেনের ছোটদি সবাইকে খাবার পরিবেশন করেছে, কত্ত রকমের খাবার নাড়ু, পিঠা, গুড়ে রাঙানো চিড়া, মুড়ি এবং সব শেষে প্রসাদ খেয়ে মহানবমী উদযাপন করলো ওরা সবাই মিলে পরের দিন বিজয়া দশমী মা দূ্র্গা মর্ত্যলোক ছেড়ে চলে যাবেন মানে প্রতিমা বিসর্জন

এই খরকা বিলেই সমস্ত প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় পরের দিন শেষ বিকেলে অনেক লোকের ভিড় ড়িয়ে একদম বিলের কাছাকাছি চলে গলো তনয় পাশেই শ্মশান তার পাশে বট গাছ ওখানে দাঁড়িয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেখার অপেক্ষায় রইলো হঠাৎ তৃণয়ীর চোখে চোখ বড়লো তনয়ের তৃণয়ী মলিন সুরে বলল সত্যই তুই আমাদের পূজোয় আসলিনা !!

তনয় ওর পকেট থেকে একটি মাটির পুতুল বের করে দিয়ে বলল সেদিন পূজোয় খেলতে গিয়ে কে যেন তোর পুতুল ভেঙ্গে ফেলেছিলো বলে তোর মনটা খুব খারাপ হয়েছিলো তাই দিনই তোর জন্য এটা কিনেছিলাম তৃণয়ীর ডাগর ডাগর চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে এলো তারপর দীর্ঘশ্বাস

রাজিব রাজিবুল হাসান

(লেখক গবেষক)

এসি/

আরো পড়ুন:

হ্রাসবৃদ্ধি-অনুপম বিশ্বাস

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ