spot_img
24 C
Dhaka

২রা ডিসেম্বর, ২০২২ইং, ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯বাংলা

কেন বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ? ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানদের দায় নেবে কে?

- Advertisement -

ইব্রাহীম খলিল জুয়েল:

জেবুন্নেসার বিয়ে হয় ২০১৪ সালে। বিয়ের কয়েক মাস পর স্বামী যৌতুকের জন্য তাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন শুরু করে। এমনকি পরে সন্তান হলে সন্তানের সামনেই তাকে নির্যাতন করা হয়। গত বছর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় এবং মেহেরুন্নেসা তার বাবা-মায়ের অনুমতি নিয়ে ২০২২ সালের ২১ জুলাই বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেন।

তার মতো গত বছর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেন ৪ হাজার ৯৭০ জন। এই বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সংখ্যাটি ২,৫৩২ জন। বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আবেদনকারী বেশির ভাগই নারী।

রাজধানী ঢাকাতেও চিত্র ভিন্ন নয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে গত ছয় বছরে অন্তত ৫০,০০০ তালাকের আবেদন জমা পড়েছে, যার মানে গড়ে প্রতি ঘণ্টায় একটি করে তালাকের আবেদন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদনের হার বেড়েছে ৩৪ শতাংশ।

পরিসংখ্যান অনুসারে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রধান কারণ বৈবাহিক দ্বন্দ্ব। বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করার কারণ হিসেবে নারীরা বলছেন- তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, বিদেশে স্থায়ী হওয়া, মাদকাসক্তি, সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি, পুরুষত্বহীনতা এবং আরও অনেক কিছু।

অন্যদিকে, পুরুষদের বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদনে যে কারণগুলি উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো- ইসলামী নিয়ম অমান্য করা, স্বামীর অবাধ্যতা, পরিবারের প্রতি উদাসীনতা, বন্ধ্যাত্ব ইত্যাদি।

সামাজিক মর্যাদা নির্বিশেষে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণগুলি প্রায় একই।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, শহরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে বরিশালে এবং সবচেয়ে কম হয়েছে সিলেটে।

ডিভোর্স প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে জরিপের পরিচালক একেএম আশরাফুল হক বলেন, “মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। দাম্পত্য জীবনে কোনো বিবাদ হলে তারা ডিভোর্স নেয় বা আলাদা থাকে। তবে বাবা-মায়ের এমন সিদ্ধান্তের জন্য সন্তানদের ভুগতে হয়।”

সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক ব্যবহারের কারণে স্বামী বা স্ত্রীরা তাদের সঙ্গীদের প্রতি বেশি সন্দেহ পোষণ করে, যা শেষ পর্যন্ত বন্ধনকে নষ্ট করে দেয়, বলছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দুই অধ্যাপক ইমাম আলী এবং ইন্দ্রজিৎ কুন্ডু।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জরিপে দেখা গেছে, বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদনের ৭০ শতাংশই স্ত্রীর।

দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করা নারীদের পরিবারগুলো সমর্থন করত না। কিন্তু বর্তমানে অভিভাবকরা অনেক বেশি সচেতন এবং তাদের মেয়েদের নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচাতে ডিভোর্সের উদ্যোগ নেন।

“সাধারণত মহিলারা বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য প্রথম যান না। বাংলাদেশে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা কেন বাড়ছে তা গবেষণার বিষয় হতে পারে,” বলছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী।

ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশনের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী আরও বলেন, “বেশিরভাগ নারীই এখন বাইরে কাজ করেন। তারা ঘরে এবং বাইরে ‘দ্বৈত দায়িত্ব’ পালন করতে করতে ক্লান্ত। অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল মহিলারা সহজেই অগোছালো সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসে।”

যাইহোক, এতে শিশুরা যে বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয় তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ভাঙা পরিবারের বাচ্চারা দীর্ঘমেয়াদে ভোগে। এটি উদ্বেগজনক।”

বাংলাদেশে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনার তথ্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ সেভাবে না থাকায় ভেঙে যাওয়া এইসব পরিবারগুলো সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না।

তবে সংখ্যাটি নেহায়েত কম নয় বলে মনে করেন গবেষকরা।

তবে এটা বলা যায় যে, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব গিয়ে পরে তাদের সন্তানদের ওপর। ভেঙে যাওয়া পরিবারগুলোর সন্তানদের বেড়ে উঠতে হয় অনেকটাই একা একা।

কেমন কাটে এই সন্তানদের জীবন?

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নিশিতা (প্রকৃত নামটি এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে না) ধানমন্ডিতে ভাড়া বাসায় থাকেন মায়ের সাথে। থাকা খাওয়া-পড়ার অর্থনৈতিক সঙ্কট মেটাতে তারা বাধ্য হয়েছেন তিন কক্ষের এই বাসাটির একটি কক্ষ সাবলেট হিসেবে ভাড়া দিতে।

নিশিতা জানান, “আমার মা-বাবার কাগজে কলমে বিচ্ছেদটা হয় বারো বছর আগে কিন্তু বাবা আমাদের ছেড়ে চলে যান আরো আগেই। আমি তখন অনেক ছোট ছিলাম এবং মা বাবার একমাত্র সন্তান ছিলাম। প্রথমেই আমাকে যে কষ্টটা ভোগ করতে হয় তা ছিল মানসিক”।

কুড়ি বছরের নিশিতা জানান, “আমার বাবা যখন চলে যায় আমি সারারাত কাঁদতাম। অনেক সময় অজান্তেই ঘুমের মাঝে হাঁটতাম। ধীরে ধীরে লেখাপড়ার দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছিলাম”।

নিশিতা জানান, তার বাবার বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের কারণে প্রায়ই তার মাকে মারধর করতেন তিনি। তার মায়ের কোনোরকম কর্মসংস্থান না থাকায় তখন বিপদে পড়তে হয় দুজনের এই পরিবারটাকে।

নিশিতা বলেন, কোনও রাতেই আমি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারতাম না। কারণ আমার মনে হতো আমি এখনই ঘুমিয়ে পড়লে আমার মাকে হয়তো মারবে।

যেভাবে কাটছে জবার জীবন

মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে এক দুপুরবেলা কথা হয় জবার সাথে। সতেরো বছর বয়সী জবা এ-লেভেল পড়ছেন। তার মা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন।

বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পরে শুরুর দিকে বাবার কাছে থাকতেন। ছোটবেলা থেকেই তার মায়ের প্রতি একধরনের ব্রীতশ্রদ্ধ মন নিয়ে বড় হতে হয় তাকে।

“আমার যখন ৫ বছর বয়স তখন আমার মা চলে যায়। ছোটবেলা থেকে আমি বড় হই এটা বিশ্বাস করে যে আমার মা আমাকে ফেলে চলে গেছে। আমার দাদা, বাবা সবাই আমাকে এই বিশ্বাস নিয়েই বড় করেন”।

পরে বাবার আর্থিক সংকট দেখা দিলে মায়ের কাছে চলে আসতে বাধ্য হন। তবে তার জীবন যে খুব একটা বদলেছে তা নয়।

“কিছুদিন আগে আব্বুর চাকরি চলে গেলে দেড় বছর আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। পরে আম্মুর সাথে যোগাযোগ করি”।

জবা নিজের কষ্টের কথা ভুলতে নিজের ওপর নানাভাবে অত্যাচার করতেন।

“স্কুলে সবাই আমাকে অন্যরকম করে দেখতো। কেউ মিশতে চাইতো না। আম্মুর কাছে চলে আসার পর দেড়বছর আমরা খালার বাসায় ছিলাম। কিন্তু আমার ও-লেভেল পরীক্ষার সময় একরাতে সেই আশ্রয়ও হারিয়ে ফেলতে হয়”।

কথা বলতে বলতে গলা ধরে আসে জবার। সে এখন চায় অন্য কোনও দেশে চলে যেতে। পরিচিত সবার চোখের আড়ালে নিয়ে যেতে চান নিজেকে।

কেমন কাটছে স্বাধীন মিয়ার জীবন

ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও স্বাধীন মিয়া হয়েছে জুতার দোকানের কর্মচারী। সে জানায়, এগারো বছর আগে তাদের বাবা তাকেসহ তিন বোনকে ফেলে রেখে চলে যায়। মা বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করে তাদের বড় করেছেন। অনেক কষ্টে বোনদের বিয়ে দেয়া হয়েছে।

সামাজিক ও মানসিক প্রভাব

বিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে এক ধরনের অনাগ্রহ কাজ করে নিশিতা ও জবার মাঝে। তারা মনে করেন ‘ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলে-মেয়ে’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সমাজ তাদেরকে একদম আলাদা করে রেখেছে। সমাজে সহজভাবে নেয়া হয় না তাদের।

ভেঙে যাওয়া পরিবারের সন্তানদের নিয়ে গবেষণা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন।

গবেষণায় তারা দেখেছেন এইসব পরিবারের ছেলেমেয়েদের সামাজিকীকরণ ব্যাহত হয়। তারা সবসময় একধরনের মানসিক চাপের মধ্যে থাকে।

“এই শিশুদের ক্ষেত্রে প্রথমেই যেটা দেখা যায় তারা স্কুলে যায় না। ফলে শিশু অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। এর ওপর তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ বা সামাজিকীকরণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে সুনাগরিক হয়ে গড়ে ওঠার জন্য যে ধরনের পরিবেশের মধ্যে থাকা দরকার তা থেকে তারা বঞ্চিত হচেছ। অনেক ক্ষেত্রেই তারা মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে যাচ্ছে”।

বিচ্ছেদের হার কি বাড়ছে?

অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন বলেন, বর্তমান সময়ে এসে বিবাহ বিচ্ছেদের হার বাড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া তথ্যে তাদের মনে হয়েছে। তবে এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনও পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না বলে তিনি জানান।

সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে বিচ্ছেদের বা পরিবার ভাঙার ঘটনাগুলোর কোনও রেকর্ড থাকে না। ফলে এইসব পরিবারের সন্তানদের সংখ্যা সম্পর্কেও সঠিক ধারনা পাওয়া যায় না। বিভিন্ন শ্রেণীতে এই হার বিভিন্ন রকম। উচ্চবিত্তদের মধ্যে যে বিচ্ছেদের ঘটনাগুলো ঘটে তার রেকর্ড থাকে।

অন্যদিকে সিটি কর্পোরেশনে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে সেখানে দেখা যাচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে বিচ্ছেদের যে ফাইলগুলো জমা পড়ছে সেখানে মেয়েরাই অধিক হারে আবেদন করছে।

আর একেবারে নিম্নবিত্ত শ্রেণীতেও আমরা দেখেছি সেখানে ব্রোকেন ফ্যামিলির সংখ্যা অনেক বেশি। কিন্তু কোনও রেকর্ড থাকে না।

তারপরও বলা যায় গত দশ বছরের পরিসংখ্যান থেকে প্রতীয়মান হয় সংসারের ভাঙনের এই প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছেই।

তবুও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন

আবার ফিরে যাই নিশিতার কাছে। তিনি এখন চান নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে। একদিন তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল যে বাবা, তাকে ছাড়াও যে জীবন চলে সেটাই প্রমাণ দিতে চান তিনি।

কিন্তু সামাজিক ও আর্থিক দিক থেকে আরও নিচের দিকে অবস্থান যাদের, তাদের পক্ষে এমন স্বপ্ন দেখাটা কঠিন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ