spot_img
29 C
Dhaka

২৭শে নভেম্বর, ২০২২ইং, ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯বাংলা

কানা গলিতে ঢুকে পড়েছে চীনের বিআরআই প্রকল্প

- Advertisement -

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, সুখবর বাংলা: দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ এখন বিদেশি মুদ্রার সঙ্কটে ভুগছে। তাই অনেক দেশই চীনের সঙ্গে বেল্ট অ্যান্ড রোড বা বিআরআই চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও ধার শোধ দিতে পারছেনা। ফলে চীনের বিআরআই প্রকল্পটিই এখন কানাগলিতে হারিয়ে যেতে বসেছে।

পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কার এখন মোটেই ধারশোধের মতো অবস্থা নেই। ইতিমধ্যেই শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। পাকিস্তানের অবস্থাও তেমনই। তারা তাকিয়ে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ড বা আইএমএফের বেল আউট প্যাকেজের দিকে। বাংলাদেশের পক্ষেও এখন বিদেশি মুদ্রা খরচ করে বিআরআইয়ে টাকা শোধ দেওয়া বেশ কঠিন। আফ্রিকান দেশগুলিরও একই অবস্থা। বিআরআই প্রকল্পের কাজ শেষ করা বা বিদেশি ঋণ পরিশোধ তাদের করও পক্ষে সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা সংস্থাগুলির প্রতিবেদন অনুসারে, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলি  বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র ঘাটতি মেটাতে গিয়ে চীনা প্রকল্পের ঋণফাঁদে আরও জড়িয়ে পড়েছে। ব্লুমবার্গের একটি সমীক্ষা অনুসারে, চীন প্রকল্প ঋণ থেকে জরুরি উদ্ধার ঋণের দিকে উল্লেখযোগ্যভাবে দূরে সরে গেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চীনা ব্যাঙ্কগুলি ২০১৮ সালের জুলাই থেকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককে স্বল্পমেয়াদী ২২ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে।  আর শ্রীলঙ্কা ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদী ৩.৮বিলিয়ন ডলার ঋণ পেয়েছে। অবকাঠামো ঋণের তুলনায় এই জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া ঋণে সুদের হার অনেক বেশি।

জরুরী ঋণ আসলে চীনের একটি অর্থনৈতিক কৌশল। ঋণগ্রহীতা দেশগুলি যাতে চীনা ব্যাঙ্কগুলির সাথে তাদের পুরানো প্রকল্প ঋণ পরিশোধ করতে পারে সেটাই মূল লক্ষ্য।  পাকিস্তানের বৈদেশিক ঋণের প্রায় ২৭ শতাংশ চীনের কাছে পাওনা। ঋণগ্রহীতা দেশগুলো চীন থেকে এই জরুরি ঋণ নিয়ে ভালো অবস্থানে নেই। কারণ যেটা আসে সেটাই দ্রুত ফিরে যায় চীনে। একটি আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল একটি দেশের জন্য তাই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে আরও খারাপ হয়ে যায়।

বিষয়টি বুঝতে পেরে বিআরআইয়ের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণে ২০১৭সাল থেকেই উতসাহ হারাচ্ছে বহু দেশ। পরিকাঠামো প্রকল্পগুলিও বাধার মুখে পড়ছে। দেশে দেশে শুরু হয়েছে বিআরআইয়ের কড়া সমালোচনা।  তাই এবছর প্রথম ছয় মাসে বিআরআইয়ের বিনিয়োগ এবং অর্থায়ন ২০১৯ সালের এই সময়ের তুলনায় ছিল মাত্র ৪০ শতাংশ। শ্রীলঙ্কা ২০২২ সালে কোনো নতুন বিআরআই ঋণ পায়নি। চীনের বিআরআই বেলুন ফেটে গেছে। বহু দেশ চীনা ঋণফাঁদের আসল মতলব বুঝতে পেরে এখন বিআরআই থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, প্রকল্পগুলিকে সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি ঋণের শর্ত গোপন রাখতে চীনা সংস্থাগুলি প্রায়শই ঋণগ্রহীতা দেশগুলির রাজনীতিবিদ এবং সামরিক কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদান করে। তাই আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলি ঋণগ্রহীতা দেশগুলির ঋণযোগ্যতা মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়। ঋণগ্রহীতা দেশগুলির অর্থনীতি বিপর্যস্ত হতে থাকে। ২০১৪ সালে, বিআরআইয়ের অধীনে ঋণগ্রহীতা দেশগুলির মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ দেশে নগদ অর্থের অভাব দেখা দিয়েছিল। অথচ ২০২২ সালের মাঝামাঝি প্রায় ৭০ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়।  গরিব দেশগুলির পাওনাকৃত ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশ চলে যায় চীনের কাছে।

অবানিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি, অভ্যন্তরীণ গোলমাল এবং জাতিগত সমস্যার পাশাপাশি ২০২০ সালে করোনা মহামারি এবং সাম্প্রতির রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ চীনকে আরও অসুবিধায় ফেলেছে। দেশগুলি ঋণ পরিশোধ করার মতো অবস্থায় না থাকায় বেজিংয়ের সমস্যা আরও বেড়ে গিয়েছে। তাছাড়া পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর নির্মাণ প্রকল্প এখনও শেষ হয়নি। ২ বছর ধরে কোনও বিদ্যুত মাশুল দিচ্ছেনা পাকিস্তান। ২০১৮ সাল থেকেই তারা চুক্তির শর্ত মানছেনা। আসলে চীনা প্রকল্পের কোনও বানিজ্যিক মূল্য নেই। তাইস্থা শ্রীলঙ্কার জাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, হাম্বানটোটা বন্দর এবং কলম্বো বন্দর নগরী প্রকল্প ব্যর্থ হতে বসেছে। অগাস্টের শেষ দিকে, বেইজিং আবারও কলম্বোর ঋণ পুনর্গঠনের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। অনুমান করা হচ্ছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে  শ্রীলঙ্কা ঋণ পরিশোধের বিনিময়ে চীনের কাছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার পাওনা রয়েছে। কলম্বোকে চীনা ব্যাঙ্কের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে বলেছে বেইজিং।

পাকিস্তানের শ্রীলঙ্কার মতোই অবস্থা হতে চলেছে বলে আশঙ্কা করেছে তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্ক অফ পাকিস্তান। ইসলামাবাদকে দেউলিয়ার হাত থেকে বাঁচাতে আইএমএফ অবশ্য শর্তস্বাপেক্ষে ৬ বিলিয়ন ডলার প্যাকেজ দিতে রাজি হয়েছে। তবে এর প্রধান শর্তই হচ্ছে চীন পাকিস্তান ইকনোমিক করিডরের জন্য বেজিং থেকে আর কোনও অর্থ ইসলামাবাদ নিতে পারবেনা। ফলে পাকিস্তান কিছুটা সুবিধা পেলেও চীনের বিআরআই প্রকল্পের ঋণ আদায়ে সমস্যা থাকছেই।  চীনে ভূমি দস্যুনীতি, স্থানীয়দের বঞ্চিত করে শ্রমিকদের অর্থ প্রদানে কার্পণ্যও পাকিস্তানিদের  ক্ষিপ্ত করে তুলেছে বলে ইসলামাবাদের গণমাধ্যম লাগাতর প্রচারনা চালাচ্ছে।

ফিনান্সিয়াল টাইমসের সঙ্গে সাক্ষাতকারে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী মোস্তফা কামাল মন্তব্য করেছেন, দুনিয়া জুড়ে বিআরআই প্রকল্প নিয়ে যে সমালোচনার ঝড়় বইছে সেটা কিছুতেই বেজিং উপেক্ষা করতে পারেনা। ১২ আগস্ট এই সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, ‘সবাই চীনকে দোষারোপ করছে। চীনেরও দ্বিমত প্রকাশের কোনও জায়গা নেই। এটা তাদেরই দায়।’ একই সঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘শ্রীলঙ্কার পরে, আমরা অনুভব করেছি যে চীনা কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিশেষ দিকটির প্রতি যত্ন নিচ্ছে না।’ তাঁর সাফ কথা, ‘পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, দুনিয়ার সবাই বিআরআই প্রকল্পে সম্মত হওয়ার আগে দুবার ভাববে’।

বাংলাদেশও বিআরআই প্রকল্পের জন্য চীন থেকে কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলার গ্রহণ করেছে। তাই এখন আর্থিক সঙ্কট থেকে বাঁচতে আইএমএফের কাছে সাহায্য চেয়েছে ঢাকা। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা স্ট্যান্ডার্ট অ্যান্ড পুওর (এস অ্যান্ড পি) বাংলাদেশকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে,  মুদ্রার আরও অবমূল্যায়ন অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়িয়ে দেবে এবং বাহ্যিক ঋণ পরিষেবা ব্যয়কেও আরও ব্যয়বহুল করে তুলবে। গত জুন থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে টাকার মূল্য মার্কিন ডলারে তুলনায় অন্তত ১০ শতাংশ কমেছে।

আফ্রিকান দেশগুলিতে চীনের মোট ঋণের পরিমান ১৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চীনা ঋণের প্রধান প্রাপক দেশগুলির মধ্যে রয়েছে অ্যাঙ্গোলা, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, জাম্বিয়া এবং ক্যামেরুন। ২০২১ সালের মার্চে আইএমএফের সমীক্ষা অনুসারে, কেনিয়া স্ট্যান্ডার্ড গেজ রেলওয়ে প্রকল্পের নির্মাণে অর্থায়নের জন্য চীনের কাছ থেকে প্রায় ৬৩ শতাংশ ঋণ নিয়েছে। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সমীক্ষা অনুসারে, সামগ্রিকভাবে উচ্চ ঋণ সংকটে থাকা আফ্রিকান দেশগুলির মোট বাহ্যিক ঋণের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি চীনা ঋণ। ২০১৬ সালের মার্চ মাসেই রয়টারের প্রতিবেদনে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ আঙ্গোলা চীনা ঋণশোধ দিতে গিয়ে প্রায় দেউলিয়া হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়েছিল।

সবমিলিয়ে চীনা ঋণগ্রহিতারা কেউ ভালো নেই। দক্ষিণ এশিয়া বা আফ্রিকার বিআরআই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্তদের  সকলেরই আর্থিক অবস্থাই বেশ শোচনীয়। তাই ঋণ পরিশোধ করাও তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এই অবস্থায় চীনের বিআরআই প্রকল্পের ভবিষ্যতও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

কেকে/ওআ

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ