spot_img
31 C
Dhaka
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

১লা অক্টোবর, ২০২২ইং, ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯বাংলা

করোনা-পরবর্তী মন্দা কি নতুন ফ্যাসিবাদের জন্ম দেবে

- Advertisement -

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
আজ যুগান্তরের জন্য আমার নিয়মিত কলাম ‘তৃতীয় মত’ লিখতে বসেই জানতে পারলাম, ঢাকার অপর একটি মিডিয়া গ্রুপের মালিক লতিফুর রহমান ৭৫ বছর বয়সে তার নিজ গ্রাম কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বার্ধক্যজনিত রোগে মারা গেছেন। বুধবার পহেলা জুলাই তিনি মারা গেছেন। এ মৃত্যুর একটি ট্র্যাজিক দিক হল, চার বছর আগে ঠিক একই দিনে তার নাতি ফারাজ আইয়াজ হোসেন হোলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলায় মারা যান।

আরও পড়ুন: বাঙালির প্রতিটি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়নে লতিফুর রহমানের অবদানের তুলনা নেই। এজন্য তিনি সম্মাননাসূচক পদকও পেয়েছেন। তিনি যে ট্রান্সকম গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ছিলেন, তাতে ১০ হাজার মানুষ কাজ করে। তার সবচেয়ে বড় অবদান, তার পরিচালনাতেই বাংলাদেশে দুটি বিপুল পাঠক সংখ্যার ইংরেজি ও বাংলা দৈনিক প্রকাশিত হয়। তার সঙ্গে যুক্ত ম্যাগাজিন, রেডিও এবং একটি ভালো পুস্তক প্রকাশনা সংস্থা, যাকে কলকাতার আনন্দ প্রকাশনার সঙ্গে তুলনা করা চলে। লতিফুর রহমান সম্ভবত একসময় বিএনপির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাজনীতিতেও ছিলেন বিতর্কিত। আমি তার এবং তার পত্রিকা দুটির রাজনৈতিক মতামতের সঙ্গে সহমত পোষণ করি না; তথাপি বাংলাদেশে শিল্পোন্নয়নে এবং সংবাদপত্র শিল্পে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, সেজন্য তাকে সম্মান করি এবং তার মৃত্যুতে আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশ করছি।

লতিফুর রহমান ছিলেন ঢাকার দুটি আধুনিক দৈনিকের পরিচালক। তার কথায় তাই করোনা বা কোভিড-১৯ এর হামলায় বিশ্বের সর্বত্র প্রিন্টিং মিডিয়ার দুর্দশার কথা এসে গেল। করোনার হামলায় বিশ্বে যেসব প্রতিষ্ঠান সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার মধ্যে প্রিন্টিং মিডিয়া একটি। এ মিডিয়ায় জড়িত সাংবাদিক, টাইপ-সেটার, মেশিনম্যান থেকে কাগজ বিক্রেতা হকার পর্যন্ত সবাই ক্ষতিগ্রস্ত এবং অনেকেই বেকার। আমার প্রতিবেশীর ছেলেটি নিউজবয় হিসেবে পাড়ায় কাগজ বিলি করত, তার চাকরিটিও নেই। এখন হাট-বাজার করাও অনলাইননির্ভর। সাংবাদিকরা ঘরে লকডাউনে বসে কাজ করতে করতে অস্থির হয়ে উঠেছেন। এক তুর্কি নারী সাংবাদিক লিখেছেন, ‘আগে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে মিট করতে আতাতুর্ক পার্কে যেতে না পারলে সাময়িক অস্থিরতায় ভুগতাম, এখন স্থায়ী অস্থিরতায় ভুগছি।’

করোনার দাপটে লন্ডনের টাইমস, গার্ডিয়ান, টেলিগ্রামের মতো কাগজের চেহারা স্লিম হয়ে গেছে। বিজ্ঞাপন কমেছে, সার্কুলেশন কমেছে তার চেয়েও বেশি। কোনো কোনো দৈনিক প্রিন্টিং এডিশন বন্ধ করে দিয়ে অনলাইনে চলে গেছে। কোনো কোনো দৈনিক ও সাপ্তাহিক বন্ধ হয়েছে। করোনায় বাংলাদেশে অনেক সাংবাদিক মারা গেছেন। সারা বিশ্বে কত অসংখ্য সাংবাদিক বেকার হয়েছে, তার আলাদা হিসাব এখনও জানা যায়নি।

সংবাদপত্র শিল্প যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও ক্ষুণ্ন হবে। তখন আর হাসিনা সরকারকে দোষারোপ করে লাভ হবে না। দোষারোপ করতে হবে বিশ্ব বিধাতাকে। তার করোনা রোগের জন্যই সংবাদপত্রের সার্কুলেশন কমেছে। ফলে বিজ্ঞাপনের আয়, বিক্রির আয় কমেছে। সংবাদপত্র শিল্পকে আবার চাঙ্গা হয়ে ওঠার জন্য হয় সরকারের কোনো প্যাকেজ পরিকল্পনা অথবা মালিকদের কোনো উদ্ধার পরিকল্পনার ওপর হয়তো নির্ভর করতে হবে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে দাবি উঠেছে, বিদেশ থেকে নিউজপ্রিন্ট আমদানির ওপর ট্যাক্স কমানো অথবা তুলে দেয়ার জন্য।

অপরের সাহায্য চাইতে গেলে নিজের কথা বলার স্বাধীনতা কিছুটা কমাতে হতে পারে। বাংলাদেশে সেটি যে মিডিয়া কমাতে পারে না, মিডিয়া স্টার গ্রুপের দুটি দৈনিকের বর্তমান ভূমিকা দেখেই বোঝা যায়। নিজেরা এখন যে স্বাধীনতা রক্ষা করতে চাইছেন না, সেই স্বাধীনতা খর্ব করার দায়ে তাদের পালিত কলামিস্টরা সরকারের বিরুদ্ধে নানা হাস্যকর যুক্তির অবতারণা করে চলেছেন। তাদের একজন সম্প্রতি লিখেছেন, সরকার মুঠোফোন, ফেসবুক ইত্যাদির ওপর নতুন বাজেটে কর বাড়িয়ে দেয়ায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও কথা বলার স্বাধীনতা খর্ব করেছেন। সাধারণ মানুষের দ্বারা বহুল ব্যবহৃত এবং বর্তমান লকডাউনের ফলে আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত মুঠোফোনের ওপর কর বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা চলে না। কিন্তু তাকে সংবাদপত্রের বা কথা বলার স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা বলা হাস্যকর ছাড়া আর কিছু নয়।

করোনা গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে যে বিপর্যয় ঘটিয়েছে, তার ধাক্কা সরকারকে যেমন পোহাতে হবে; জনসাধারণকেও তেমনি পোহাতে হবে। পোহাতে হবে বিশ্বের সংবাদপত্র শিল্পকেও। ব্রিটেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ওয়েলফেয়ার স্টেট। সেই স্টেটে জনগণকে দেয়া বহু যুগের সুবিধা ও সার্ভিসগুলো বাতিল করা শুরু হয়েছে। আগে ৭০ বছর বয়সের ঊর্ধ্বের বুড়োদের জন্য ছিল ফ্রিডমপাস। অর্থাৎ বুড়ো-বুড়িরা ওই পাস নিয়ে বাসে, ট্রামে, টিউবে বিনা ভাড়ায় ভ্রমণ করতে পারতেন। এখন পারবেন না। তাদের রেডিও-টেলিভিশনের জন্য ফি দিতে হতো না। ব্রিটেনের টোরি সরকার তা বাতিল করতে চেয়েছেন। বুড়ো ও অল্প আয়ের মানুষদের জন্য চিকিৎসার যে ফ্রি প্রেসক্রিপশন ছিল, তাও বাতিল হবে বলে শোনা যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই প্রেসক্রিপশনে আগে যে ওষুধ ও মলম বিনামূল্যে দেয়া হতো, তার ওপর আবার মূল্য ধার্য করা হয়েছে।

একই অবস্থা চলছে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী দেশ যুক্তরাষ্ট্রেও। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগে থেকেই ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট আসছে বলে অহরহ সতর্কবাণী উচ্চারণ করছেন এবং এই জুজুর ভয় দেখিয়ে আগের প্রেসিডেন্ট ওবামা সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যবীমা প্রবর্তন থেকে যেসব কল্যাণ ব্যবস্থা ও সার্ভিসের ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন, সেগুলো বাতিল করতে শুরু করেছেন।

বিশ্ব ধনতন্ত্র যে করোনার ভয়াবহ ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ নেবে এবং অর্থনৈতিক মন্দা কাটানোর নামে জনগণের ওপর আরও অসহনীয় দারিদ্র্য চাপিয়ে দিয়ে ধনতন্ত্রকে রক্ষার চেষ্টা করবে, তাতে সন্দেহ নেই। বিশ্বের সাধারণ মানুষ যদি এ বোঝা বহন করতে না চেয়ে বিদ্রোহী হয়, তাহলে উন্নত দেশগুলোর কোনো কোনো দেশেই ফরাসি বিপ্লবের মতো বিপ্লব ঘটতে পারে। আমাদের সুশীল সমাজের অতি প্রিয় ধনবাদী গণতন্ত্রের পতন ঘটে সমাজতন্ত্র না হোক, সমাজবাদী নতুন গণতন্ত্রের উদ্ভব হতে পারে। আবার ত্রিশের মন্দায় ইউরোপে ধনবাদ যেমন বর্বর ফ্যাসিবাদের রূপ ধারণ করেছিল, বর্তমানের অর্থনৈতিক মন্দা তার চেয়েও ভয়াবহ ফ্যাসিবাদের উদ্ভব ঘটাবে। যদি ঘটায়, তাহলে ঘটাবে বর্তমানের রেসিজম ও ফ্যাসিজমে আকীর্ণ আমেরিকায় ট্রাম্প প্রেসিডেন্সির মাধ্যমে। ফলে অনেকেই প্রার্থনা করছেন, আমেরিকার আগামী নভেম্বরের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে ট্রাম্প যেন না জেতেন।

কিন্তু ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে না জয়ী হলেও আমেরিকা ফ্যাসিবাদের থাবা এড়াতে পারবে বলে মনে হয় না। এ ফ্যাসিবাদ বুশ প্রেসিডেন্সির আমলে ‘নিওকনজারভেটিভস’ বা ‘নিওকন’ হিসেবে জন্ম নিয়েছে এবং ট্রাম্পের মাধ্যমে আরও নিষ্ঠুরভাবে আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে। লন্ডনের সানডে টাইমস-এর মতো দায়িত্বশীল পত্রিকা খবর দিয়েছে- ট্রাম্প সমর্থক একদল এক্স-মেরিন সভা করে দাবি করেছেন, আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে ব্যাপক ভোট জালিয়াতি করে ট্রাম্পকে হারানোর চক্রান্ত চলছে। তা যদি হয়, তাহলে তারা নির্বাচনের ঘোষিত ফল মানবে না। অন্য পন্থা ধরবে। এই অন্য পন্থাটা কি?

আমার পাঠকদের মনে থাকতে পারে, আমেরিকার গত প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প একই হুমকি দিয়েছিলেন- নির্বাচনে পরাজিত হলে তিনি নির্বাচনের ফল মানবেন না। এই একই হুমকি দিয়ে হিটলার এবং মুসোলিনী গত শতকে জার্মানি এবং ইতালিতে নির্বাচনী প্রহসনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন এবং সারা ইউরোপে ফ্যাসিবাদের ভয়াবহ অভ্যুত্থান ঘটেছিল।

বিশ শতকের ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছিল ত্রিশের দশকের অর্থনৈতিক মন্দা। একুশ শতকের আরও ভয়াবহ মন্দা এবার আমেরিকায় আরও ভয়াবহ ফ্যাসিবাদের অভ্যুত্থান ঘটায় কিনা, সেই আশঙ্কাই পশ্চিমা অনেক সমাজ বিজ্ঞানী করছেন। কিন্তু সেই সঙ্গে তারা আশার কথাও বলছেন। তারা বলছেন, আমেরিকার সাদা-কালো জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন। জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডেই দেখা গেছে, সারা আমেরিকা বর্ণবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কতটা সোচ্চার। এই গণদেবতার জাগরণ আমেরিকায় ফ্যাসিবাদ ও বর্ণবাদকে রুখে দেবেই। যদি তা হয়, তাহলে পল রবসনের সেই গান সত্য হবে- ‘We are now victorious-victorious for ever; আমরা এখন জয়ী, চিরকালের জন্য জয়ী।’

লন্ডন, ৫ জুলাই, রোববার, ২০২০

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ