spot_img
25 C
Dhaka

২৭শে নভেম্বর, ২০২২ইং, ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯বাংলা

ঐতিহাসিক ও পর্যটক সমৃদ্ধ স্থান বালিয়াটি জমিদার বাড়ি

- Advertisement -

সাইদ মাহবুব, সুখবর বাংলা: ঢাকা বিভাগের অন্যতম একটি জেলা মানিকগঞ্জ। মানিকগঞ্জ জেলা নানা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ। মানিকগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক ও পর্যটক সমৃদ্ধ স্থান বালিয়াটি জমিদার বাড়ি।

বালিয়াটি জমিদার বাড়িকে নিয়ে রয়েছে নানা ইতিহাস, ঐতিহ্য। বালিয়াটি জমিদার বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলার কেন্দ্রস্থল বালিয়াটি ইউনিয়নে অবস্থিত। ঢাকার গাবতলি থেকে প্রায় ৪৫ কি.মিঃ উত্তরপশ্চিমে সাটুরিয়া  উপজেলায় বিখ্যাত বালিয়াটি জমিদার বাড়ি অবস্থিত। সাটুরিয়াকে বলা হতো তৎকালীন ঐ অঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্যের রাজধানী। সাটুরিয়ার চারপাশ দিয়ে বয়ে চলা গাজীখালী ও ধলেশ্বরী নদীর শাখা ছিলো। এই নদী পথকে ঘিরেই এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য তথা জীবিকা নির্বাহ হতো। আশেপাশের সমস্ত বড় বড় ব্যবসায়ীরা এখানে ব্যবসা করতো। আর এ অঞ্চলের সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হতো বালিয়াটি জমিদার বাড়ি থেকে। কারণ জমিদাররা ছিলেন সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী বা বণিক।

মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলায় অবস্থিত বালিয়াটি জমিদার বাড়ি উনিশ শতকে বাংলাদেশে নির্মিত প্রাসাদ সমূহের মধ্যে অন্যতম। এ জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জনৈক গোবিন্দ রাম সাহা। যিনি একজন মহাজন ও ব্যবসায়ী ছিলেন। গোবিন্দ রাম সাহার চার পুত্র ছিল দধী রাম,পন্ডিত রাম, আনন্দ রাম এবং গোলাপ রাম। ধারণা করা হয় তার চার পুত্রই পরবর্তিতে প্রাসাদগুলো নির্মাণ করেন। জমিদার বাড়িটিতে অনেকগুলো স্থাপনা রয়েছে যেগুলো পাচঁটি পৃথক ভাগে বিভক্ত। দক্ষিণ দিকে অর্থাৎ সম্মুখভাগের ইমারতগুলোতে কোরিনথিয় স্তম্ভের সারি রয়েছে। এছাড়াও স্থাপনাগুলোতে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য লক্ষ করা যায়। জমিদার বাড়ির ভেতরে রংমহল নামে খ্যাত ভবনে বর্তমানে জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে।

সাটুরিয়ার পাশে উত্তর কাওন্নারা গ্রামে, জমিদারদের একটি বাগান বাড়ি ছিলো। বাগান বাড়ির বড় পুকুরের মাঝখানে একটা মহল ছিলো। কথিত আছে সেখানে গানবাজনাও হতো। বালিয়াটি জমিদারদের এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি প্রায় ২০০ বছরের পুরাতন। ১৬,০০০ বর্গমিটার আয়তনের বিশাল এই জমিদার বাড়িটিতে প্রায় ২০০টি কক্ষ রয়েছে। বালিয়াটি জমিদার বাড়ি বর্তমানে বাংলাদেশের জমিদার বাড়িগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড়। জমিদারবাড়ির পেছনে অবস্থিত পুকুরের তিন প্রান্তে পাঁচটি ঘাট আছে এবং অপর প্রান্তে বেশকিছু শৌচাগার রয়েছে। মূল জমিদার বাড়ির সামনে বিশাল আরও একটি পুকুর রয়েছে। এছাড়াও এর আশেপাশে অসংখ্য পুকুর রয়েছে।

মূল জমিদার বাড়ি থেকে একটু পেছনে তাদের আরও একটা বাড়ি আছে। সেখানে একটি বড় কুয়া, পূজোর স্থান ও বেশ কিছু কক্ষ রয়েছে। মূল বাড়ি থেকে আলাদা করে এ বাড়িটি কেন করা হয়েছিলো তা আজো অজানা।

এই প্রাসাদটি ‘দশ-আনি-জমিদারবাড়ি’ নামেও পরিচিত। জমিদারবাড়ির একটি অংশ রায় চাঁদের কাছ থেকে অন্যান্য জমিদারদের প্রথম স্ত্রীদের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্তির কারণে পরিচিত ছিল। তৎকালীন সময়ে বালিয়াটিতে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় এ অঞ্চলের মানুষদের পাকুটিয়া গিয়ে পড়াশোনা করতে হতো। কিশোরিলাল রায় চৌধুরী ওখানে পড়তে গেলে তাকে অপমান করেন এখানকার জমিদার।এরপর কিশোরিলাল রায় চৌধুরী আত্মহত্যা করেন। এরপর থেই রায়বাহাদুর হরেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে জ্ঞান বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন এবং এই কারণে বালিয়াটি স্কুল, জগন্নাথ কলেজ এবং কে এল জুবিলী হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

মূল জমিদারবাড়িতে পাঁচটি একই রকম কিন্তু ভিন্ন ভাগ ছিল। জমিদার বাড়ির দক্ষিণে বর্তমানে স্থায়ী ৪টি আকর্ষণীয় অংশ অবস্থিত। এগুলোর মধ্যে মাঝের দুটি অংশ হল দোতলা এবং পাশের বাকি তিনটি অংশ তিনতলা। এই প্রাসাদের চারটি ব্লকের পিছন অংশে চারটি আলাদা আভ্যন্তরীণ ভবন বা অন্দর্মহল আছে। উত্তরদিকে কিছুদূরে অবস্থিত পরিত্যক্ত ভবনটি হল বহির্মহল যা কাঠের কারুকার্য সম্পন্ন। বড় চারটি মহলের পেছনে বেশকিছু মহল দেখা যায়। এই ভবনে প্রাসাদের চাকর বাকর, গাড়ি রাখার গ্যারেজ, ঘোড়াশাল ছিল বলে ধারণা করা হয়। এই বিশাল প্রাসাদটির চারপাশ সুউচ্চ দেয়াল দ্বারা পরিবেষ্টিত। এই প্রাসাদের তিনটি প্রবেশপথ আছে। গেইটের উপরে সিংহের মূর্তি রয়েছে।

জমিদার বাড়িকে ঘিরে থাকা সুউচ্চ প্রাচীরে তিনটি চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর ফটক রয়েছে। বর্তমানে ‘বালিয়াটি প্রাসাদ’ নামকরণ করে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর এই জমিদারবাড়িটির অধিগ্রহণ করে দেখাশোনা করছে। সময় এবং সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে জমিদার বাড়িটিকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে বারোটি অধ্যায়ের মাধ্যমে। প্রথম ভাগে সময়, শৈলী এবং ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে জমিদার বাড়ির স্থাপত্যশৈলীর বিস্তারিত বিবরণ ক্রমানুযায়ী বর্ণনা করা হয়েছে। শেষভাগে বর্তমান প্রেক্ষাপটে জমিদারবাড়ির গুরুত্বকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এক কথায় বলা যায়, প্রথম থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই জমিদারবাড়ির ইতিহাস চমৎকারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ঢাকার নিকটবর্তী হওয়ায় গাবতলি হতে কালামপুর দিয়ে সাটুরিয়া গেলেই যে কোনো গাড়িতে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি যেতে পারবে যে কেউ।

ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা বলেন, বালিয়াটি জমিদার বাড়ি বাংলাদেশের পর্যটন স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং সুন্দর একটি স্থান। জমিদার বাড়ির স্থাপনা ও পরিবেশ অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। তবে জমিদার বাড়িটির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি প্রয়োজন।

পর্যটক ও স্থানীয়রা মনে করছেন, যথাযথ তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ করলে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি পর্যটক আকর্ষণের কেন্দবিন্দু হয়ে উঠবে।

আরো পড়ুন:

বহুমুখী প্রতিভাবান একজন শিল্পী মারজুক রাসেল

- Advertisement -

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করুন

25,028FansLike
5,000FollowersFollow
12,132SubscribersSubscribe
- Advertisement -

সর্বশেষ