Thursday, September 23, 2021
Thursday, September 23, 2021
danish
Home Latest News একুশে আগস্টের নৃশংসতাকে ধিক্কার জানাই

একুশে আগস্টের নৃশংসতাকে ধিক্কার জানাই

ড. প্রণব কুমার পান্ডে :

আগস্ট মাস বাঙালির ইতিহাসে সবচেয়ে কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয় কারণ এই মাসেই ইতিহাসের জঘন্যতম দুটি ঘটনা ঘটেছিল। একটি ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট  যেদিন বিশ্বাসঘাতকের দল দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছিল। সেদিন ঘাতকদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলার ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে চিরতরে মুছে ফেলা। তারা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল যে বঙ্গবন্ধুর কোনও বংশধর যেন বাংলার মাটিতে বেঁচে না থাকে। আর এই জন্যই খুনিরা ছোট্ট রাসেলকেও হত্যা করতে দ্বিধা করেনি। কিন্তু তাদের সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি কারণ বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা- শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেই সময় দেশের বাইরে অবস্থান করায় বেঁচে যান।

যেহেতু শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে এসে সামরিক শাসনের নিষ্পেষণে নিষ্পেষিত ভঙ্গুর আওয়ামী লীগের দায়িত্ব গ্রহণ করে, দলকে শক্তিশালী করে, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন; সেহেতু এই হায়নার দল আবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় শেখ হাসিনাকে হত্যার।

২০০১ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসতে ব্যর্থ হলে বিএনপি’র নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার গঠন করার পর থেকেই আওয়ামী লীগের ওপরে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালানো হয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের জনসভায় শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়।

১৫ই আগস্ট এর মতো ২১শে আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের আর একটি জঘন্যতম দিন। কারণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তৎকালীন সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী তথা আওয়ামী লীগের সভানেত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যে জঘন্যতম গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। এই ধরনের হামলা সভ্য সমাজে বিরল ঘটনা। সেই দিন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জীবনের বিনিময়ে শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতা-কর্মী নিহত হন। শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ নেতা-কর্মী আহত হন যারা আজও নিজেদের শরীরে গ্রেনেডের স্প্রিন্টার বহন করে বেঁচে আছেন অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে।

এই গ্রেনেড হামলাকে কেন জঘন্যতম ঘটনা বলা হয়? কারণ আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি তৎকালীন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর জ্ঞাতসারেই এই হামলা চালানো হয়েছিল। হামলা-পরবর্তী সময়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আমরা জজ মিয়া নাটকের মঞ্চায়ন দেখেছিলাম। কিন্তু যে বিষয়টি ঘাতকেরা কখনোই মনে রাখে না সেটা হল সত্য কখনোই চাপা থাকে না। সত্য একদিন প্রকাশ হবেই। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট এর ঘটনার পেছনের মূল নায়কদের মুখোশ উন্মোচিত হতে দেখেছি। বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে  তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রাহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে এই মামলায়। আর এই কারণেই বলা হয়েছে যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সেই হামলা চালান হয়েছিল। কোনও একটি রাজনৈতিক দলকে নিশ্চিহ্ন করার নিমিত্তে সেই দলের নেতাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে গ্রেনেড হামলা করা কোনও সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কখনোই কাম্য হতে পারে না।

আমরা যদি একুশে আগস্টের ঘটনাটিকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি তাহলে যে জিনিসটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে সেটি হচ্ছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের প্রেতাত্মারা এই ঘটনার পেছনের মূল চালিকাশক্তি ছিল। কারণ সেই দিন এই ঘাতকেরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে এটা প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে বঙ্গবন্ধু বা তাঁর ঔরসজাত কেউ বাংলাদেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। কিন্তু তখন তারা ভুলে গিয়েছিল যে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। যেহেতু শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেদিন ভাগ্যের জোরে দেশের বাইরে থাকার কারণে বেঁচে গিয়েছিলেন, এই ঘাতকেরা কখনোই এটি ভেবেছিল না যে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা একদিন দেশে ফিরে এসে তার বাবার হত্যার বিচার করবেন এবং ফাঁসির রায় কার্যকর করবেন।

শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার পর থেকেই এই ঘাতকেরা পুনরায় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং তাদের ষড়যন্ত্র পূর্ণতা পায় ২০০১ সালের নির্বাচনে যখন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হয়। সেই দিক থেকে বিচার করলে একথা স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া বন্ধের জন্যই আসলে ঘাতকের দল চেয়েছিল শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যা করতে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করা। আর তাঁকে হত্যা করা গেলে আওয়ামী লীগ পুনরায় বিভিন্ন অংশে খন্ডিত হয়ে যেত এবং আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় আসতে পারতো না। যদি ক্ষমতায় আসতে না পারত তাহলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বাংলার মাটিতেই কখনোই হতো না। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কারণেই একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল।

একুশে আগস্ট এর ঘটনায় আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রাণে বেঁচে গেলেও তিনি বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হন। তিনি তাঁর শ্রবণশক্তি প্রায় হারিয়ই ফেলেছিলেন। একই সাথে অনেক কেন্দ্রীয় নেতা এবং কর্মী আজ পর্যন্ত নিজেদের শরীরে স্প্রিন্টা্রের অসহ্য বেদনা বহন করে চলেছেন যা সত্যিই খুব কষ্টের। তবে সুখের বিষয় হচ্ছে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে একদিকে যেমন তাঁর বাবার হত্যার বিচার করেছেন ঠিক তেমনি একুশে আগস্টের ঘটনায় জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করেছেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জড়িত সকল খুনিদের যেমন বিচারিক আদালতের রায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি ঠিক তেমনি ২১শে আগস্টের ঘটনায় সাজাপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন আসামীকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে এসে মামলার রায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। ফলে এই মুহূর্তে সরকারের  উচিত উভয় মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে এসে বিচারের রায় কার্যকর করা। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন বঙ্গবন্ধুর আত্মা শান্তি পাবে, ঠিক তেমনিভাবে একুশে আগস্টে যারা নিহত হয়েছেন এবং যারা আজও পর্যন্ত স্প্রিন্টারের অসহনীয় যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন তারাও শান্তি পাবেন।

বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি কাজ করে গেছেন বিধায় সংবিধানের মূল ধারায় ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টি সংযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে বিভিন্ন সময়ে এই ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়টিকে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।  এটি তুলে দেওয়ার কারণেই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি শক্তিশালি হয়েছে। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার সরকার দেশ পরিচালনা করবে এটাই কাম্য হওয়া উচিত। কিন্তু অনেকেই এই বিষয়টির সাথে দ্বিমত পোষণ করেন বিধায় সর্বদা চেষ্টা করেন বাংলাদেশে যে কোনও প্রক্রিয়ায় অসম্প্রদায়িক সরকারকে উৎখাতের।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যেহেতু ২০০৮ সাল থেকে প্রায় একযুগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় রয়েছে সেহেতু সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে হয়তো কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতাও রয়েছে। সেটি একেবারেই প্রাসঙ্গিক। কারণ কোনও দেশের সরকারই সব সময় এটা দাবি করতে পারে না যে তারা সব সময় ভালো কাজ করবে। আর দল যখন দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতায় থাকে তখন এক শ্রেণীর অনুপ্রবেশকারীর জন্ম হয় যারা দলের নাম ভাঙ্গিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করে। কিন্তু বর্তমান সরকারকে সাধুবাদ জানাতে হবে এই জন্য যে, অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অবশ্যই এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে রাজনীতির কারণে হয়তো কখনও কখনও বিভিন্ন পক্ষের সাথে সরকার আপস করেছে যেটি হয়তো অনেকেই আওয়ামী লীগের কাছে প্রত্যাশা করেনি। ফলে, সরকারের তরফ থেকে বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করা দরকার। তাদের এই বিষয়টি মনে করা দরকার যে এই সমস্ত শক্তির সাথে আপোষ দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।  

গত দেড় বছরের ওপর বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সকল দেশ কোভিড-১৯ মহামারীর বিপর্যয় মোকাবিলায় ব্যস্ত সময় পার করছে। আমাদের দেশ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যোগ্য নেতৃত্বে বেশ ভালোভাবেই এই মহামারী মোকাবেলা করছে। মহামারী থেকে বাঁচবার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ভ্যাকসিন পৃথিবীর অনেক দেশ পর্যাপ্ত পরিমাণ যোগাড় করতে না পারলেও আমাদের দেশে ভ্যাকসিনের সরবরাহ যথেষ্ট পরিমাণ রয়েছে।  আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করলে এই মহামারী উত্তোরণ করা যাবে খুব সহজে। তবে এই আগস্ট মাসে আমাদের সকলের উচিত জাতীয় শোক দিবস এবং একুশে আগস্টের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো।

আসুন আমরা সকলে এই দুটো শোক থেকে শক্তি সঞ্চার করে মহামারী মোকাবেলা করি এবং করোনা মহামারী মুক্ত বাংলাদেশকে পৃথিবীর মানচিত্রে উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করি।

লেখক: অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments